অস্থায়ী সরকার ফেব্রুয়ারি ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচনের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন শেষ করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যাবে, এ বিষয়ে আজ আর্থিক উপদেষ্টা সালেহুদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট বক্তব্য রাখেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও এখনো বিভাজন সম্পন্ন হয়নি, তবে জানুয়ারি অথবা নির্বাচনের দিন পর্যন্ত কাজটি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মন্তব্যটি সেক্রেটারিয়েটের প্রেস কনফারেন্সে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে দেওয়া হয়।
আহমেদ পূর্বে ডিসেম্বরের শেষের মধ্যে বিভাজন সম্পন্ন হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে ২০২৫ সালের শেষের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব না হলেও, কাজটি এখনও পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হচ্ছে এবং বাকি কিছু আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
বিভাজনের মূল উদ্দেশ্য হল এনবিআরকে দুটি স্বতন্ত্র সংস্থায় ভাগ করা: একটিতে কর নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব থাকবে, আর অন্যটিতে রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসনিক কাজের দায়িত্ব থাকবে। এই কাঠামোগত পরিবর্তনটি উন্নয়ন অংশীদার, অর্থনীতিবিদ এবং ব্যবসা নেতাদের কাছ থেকে উচ্চ প্রত্যাশা পেয়েছে, কারণ এটি কর ব্যবস্থার দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং রাজস্ব সংগ্রহের ক্ষমতা বাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে এই সংস্কার পরিকল্পনা এনবিআর অভ্যন্তরে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের জন্ম দেয়। মে ১২, ২০২৫ তারিখে অস্থায়ী সরকার রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আদেশ, ২০২৫ জারি করে এনবিআরকে বিলুপ্ত করে, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটিকে আর্থিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার এই পদক্ষেপকে কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের জন্য অপরিহার্য বলে ব্যাখ্যা করে।
অন্যদিকে, এনবিআর কর্মকর্তারা এই আদেশের বিরোধিতা করেন। তারা পরামর্শের অভাব এবং কর ও শুল্ক কর্মীদের ভূমিকা হ্রাসের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এই বিরোধের ফলে সংস্থার মধ্যে প্রতিবাদ, প্রশাসনিক ব্যাঘাত এবং বিভিন্ন সাসপেনশন আদেশ জারি হয়, যা দেশের আর্থিক প্রশাসনে প্রভাব ফেলেছে।
বিরোধের তীব্রতা কমাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এতে জোরপূর্বক অবসর, সাসপেনশন, স্থানান্তর এবং দুর্নীতি বিরোধী অভিযান অন্তর্ভুক্ত ছিল। এসব ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত এনবিআর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে এবং বিভাজন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিশ্চিত করে।
বিভাজনের শেষ ধাপগুলো এখনো কিছু আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আর্থিক উপদেষ্টা আহমেদ জানান, প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে, নতুন দুটি সংস্থা দ্রুত কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই রূপান্তর দেশের কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিভাজন সম্পন্ন হলে, কর নীতি বিভাগ কর আইন প্রণয়ন, কর হার নির্ধারণ এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করবে। আর রাজস্ব সংগ্রহ ও প্রশাসন বিভাগ কর আদায়, শুল্ক সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদান করবে। দুই সংস্থার পৃথকীকরণে দায়িত্বের স্পষ্টতা এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই সংস্কার দেশের আর্থিক স্বায়ত্তশাসন ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে। উন্নয়ন অংশীদারদেরও এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়ে, ভবিষ্যতে আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
অবশ্যই, এনবিআর কর্মীদের মধ্যে এখনও কিছু অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। নতুন কাঠামোর অধীনে তাদের ভূমিকা ও দায়িত্ব পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হবে, যা প্রশিক্ষণ ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে সমাধান করা যাবে। সরকার এই প্রক্রিয়ায় কর্মীদের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, অস্থায়ী সরকারের লক্ষ্য হল ফেব্রুয়ারি ১২ নির্বাচনের আগে এনবিআর বিভাজন সম্পন্ন করে, কর ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং রাজস্ব সংগ্রহের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা। যদিও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবে বর্তমান পদক্ষেপ ও সরকারী ইচ্ছাশক্তি এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিভাজন প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে, আইনগত অনুমোদন, মানবসম্পদ পুনর্গঠন এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নসহ বহু ধাপ অতিক্রম করতে হবে। এ সব কাজের সমন্বয় যদি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়, তবে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
অবশেষে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি এই রূপান্তরকে সফল করতে সকল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে অঙ্গীকারবদ্ধ, যাতে দেশের আর্থিক নীতি ও কর সংগ্রহের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী উন্নতি নিশ্চিত করা যায়।



