ভারতীয় তেল শোধন শিল্পের শীর্ষস্থানীয় রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জামনগর রিফাইনারিতে গত তিন সপ্তাহে রাশিয়ার কোনো কাঁচা তেল পৌঁছায়নি, এবং জানুয়ারি মাসে কোনো সরবরাহের প্রত্যাশা নেই। কোম্পানি সোমবার প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে জানায়, এই সময়কালে রাশিয়ার কোনো তেল কার্গো রিফাইনারিতে প্রবেশ করেনি এবং বর্তমান মাসে নতুন কোনো রাশিয়ান তেল শিপমেন্টের সম্ভাবনা নেই।
রিলায়েন্সের এই তথ্যের পেছনে গত বছরের নভেম্বর মাসে নেওয়া একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। সেই সময়ে কোম্পানি ঘোষণা করেছিল, জামনগরের রপ্তানিমুখী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ইউনিটের জন্য রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করা হবে। এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক চাপ এবং সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছিল, যদিও রিলায়েন্সের বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
জামনগর রিফাইনারি, যা বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগারগুলোর একটি, দৈনিক প্রায় ১.২৪ মিলিয়ন ব্যারেল কাঁচা তেল প্রক্রিয়াকরণ করতে সক্ষম। রাশিয়ান তেল না পাওয়ার ফলে রিফাইনারি এখনো অন্যান্য সরবরাহকারী থেকে কাঁচা তেল সংগ্রহ করছে, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবর্তন শোধনাগারের ইনপুট মিক্সে সামান্য পরিবর্তন আনলেও, মোট শোধন ক্ষমতা বজায় রাখতে বিকল্প সরবরাহের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, রিলায়েন্সের রাশিয়ান তেল থেকে দূরে সরে যাওয়া ভারতের সামগ্রিক তেল আমদানি প্যাটার্নে প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়া বিশ্ব তেল বাজারে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী, এবং তার থেকে আমদানি হ্রাসের ফলে আন্তর্জাতিক তেল দামের ওপর চাপ বাড়তে পারে, বিশেষ করে যখন অন্যান্য সরবরাহকারী থেকে তেলের দাম তুলনামূলকভাবে উচ্চ। তবে, রিলায়েন্সের বিকল্প সরবরাহ চেইন ইতিমধ্যে স্থিতিশীল, ফলে স্বল্পমেয়াদে শোধন মার্জিনে বড় ধাক্কা না লাগার সম্ভাবনা বেশি।
ইন্ডাস্ট্রি সংস্থা অনুযায়ী, রাশিয়ান তেল থেকে দূরে সরে যাওয়া রিলায়েন্সের কাঁচা তেল ব্যয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনবে। রাশিয়ান তেল সাধারণত তুলনামূলকভাবে কম দামে পাওয়া যায়, তাই বিকল্প সরবরাহের দাম বেশি হলে শোধনাগারের উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে। এই ব্যয় বৃদ্ধি শেষ গ্রাহকদের কাছে পণ্য মূল্যে প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে পেট্রোল, ডিজেল এবং জেট ফুয়েল মতো উচ্চ চাহিদার পণ্যে।
অন্যদিকে, রিলায়েন্সের এই পদক্ষেপ ভারতীয় তেল বাজারে সরবরাহ বৈচিত্র্য বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে, কোম্পানি জিও-ইকোনমিক ঝুঁকি হ্রাসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল সরবরাহ চেইন গড়ে তুলতে চায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, রিলায়েন্সের বিকল্প সরবরাহকারী দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন ও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে ভারতীয় তেল বাজারের কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে।
বাজারে ইতিমধ্যে রাশিয়ান তেল সরবরাহের হ্রাসের ফলে তেল দামের স্বল্পমেয়াদী ওঠানামা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্ল্যাটফর্মে রাশিয়ান ক্রুডের স্পট প্রাইস সাম্প্রতিক সপ্তাহে ৩-৪ শতাংশ বাড়লেও, রিলায়েন্সের বিকল্প সরবরাহের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকায় শোধনাগারের মোট ইনপুট খরচে তীব্র পরিবর্তন ঘটেনি। তবে, দীর্ঘমেয়াদে রাশিয়ার তেল সরবরাহের পুনরায় শুরু হলে বা না হলে, ভারতীয় তেল বাজারের দামের দিকনির্দেশনা পুনরায় নির্ধারিত হতে পারে।
রিলায়েন্সের এই কৌশলগত পরিবর্তন অন্যান্য ভারতীয় শোধনাগারগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। রাশিয়ান তেল থেকে দূরে সরে যাওয়া একটি সিগন্যাল হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা অন্যান্য বড় শোধনাগারগুলোকে তাদের সরবরাহ চেইন পুনর্বিবেচনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বিশেষ করে, যদি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে, তবে রাশিয়ার তেল রপ্তানি সীমিত হতে পারে, ফলে দেশীয় শোধনাগারগুলোকে বিকল্প সরবরাহের দিকে ঝুঁকতে হবে।
সারসংক্ষেপে, রিলায়েন্সের জামনগর রিফাইনারিতে রাশিয়ান তেল না আসা এবং জানুয়ারিতে কোনো সরবরাহের প্রত্যাশা না থাকা, কোম্পানির কাঁচা তেল উৎসের বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের অংশ। স্বল্পমেয়াদে শোধন ক্ষমতা বজায় রাখতে বিকল্প সরবরাহের ওপর নির্ভরতা বাড়লেও, দীর্ঘমেয়াদে তেল দামের ওঠানামা, শোধন মার্জিন এবং সরবরাহ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি ও সুযোগ উভয়ই সৃষ্টি হবে। বাজার অংশীদারদের জন্য এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে ভবিষ্যতে তেল সরবরাহের গতি ও দামের প্রবণতা সঠিকভাবে অনুমান করা যায়।



