মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন কূটনৈতিক দিকনির্দেশনা প্রকাশ করেছেন। ১৮২৩ সালের মনরো ডকট্রিনের রূপরেখা অনুসরণ করে তিনি ‘ডনরো ডকট্রিন’ নামে একটি নীতি ঘোষণা করেন, যার মূল উদ্দেশ্য পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য নিশ্চিত করা। এই নীতির অংশ হিসেবে ট্রাম্পের নজরে এখন পাঁচটি দেশ ও অঞ্চল রয়েছে, যেগুলোর ওপর তিনি কৌশলগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত দাবি তুলে ধরেছেন।
প্রথম লক্ষ্য হিসেবে ট্রাম্প ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডকে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, রাশিয়া ও চীনের সামুদ্রিক উপস্থিতি বাড়ার ফলে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে সেখানে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। তবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন ট্রাম্পের এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে, বলেন যে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। এই বিরোধের ফলে ন্যাটো গোষ্ঠীর মধ্যে নতুন উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
দ্বিতীয় লক্ষ্য হিসেবে দক্ষিণ আমেরিকায় কলম্বিয়া উঠে আসে। ভেনেজুয়েলা অভিযানের পরপরই ট্রাম্প কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেন। তিনি পেত্রোকে ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ বলে অভিযুক্ত করে, যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারে সহায়তা করার অভিযোগ তোলেন। ট্রাম্পের মতে, কলম্বিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে এবং তিনি এই ধারণাকে ইতিবাচকভাবে স্বীকার করেছেন, যা দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের নজর ইরানের ওপর কেন্দ্রীভূত। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী প্রতিবাদকে লক্ষ্য করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ইচ্ছুকতা প্রকাশ করেন, যদি প্রতিবাদকারীদের ওপর হিংসা করা হয়। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক সুবিধায় সম্ভাব্য আক্রমণের ইঙ্গিতও দেন। এই অবস্থান ইরান-ইসরায়েল সম্পর্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুনর্গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে।
মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও ট্রাম্প নতুন পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেন। মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে মাদক ও অভিবাসী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য তিনি কঠোর নীতি গ্রহণের কথা বলেন। ক্ষমতায় ফিরে তিনি ‘মেক্সিকো উপসাগর’কে ‘আমেরিকা উপসাগর’ নামে পুনঃনামকরণ করার জন্য এক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন এবং মেক্সিকোর কার্টেল দমনকে ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই পদক্ষেপগুলো মেক্সিকোর সরকারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে, যদিও উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।
ট্রাম্পের ‘ডনরো ডকট্রিন’ বাস্তবায়নের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ও জোটের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক গতি তৈরি করতে চান। গ্রিনল্যান্ড, কলম্বিয়া, ইরান এবং মেক্সিকোতে তার দাবিগুলো ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারী প্রত্যাখ্যান ও সতর্কতা পেয়েছে। ভবিষ্যতে এই নীতির বাস্তবায়ন কীভাবে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই কৌশলগত পরিবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা ও সমন্বয়ের সম্ভাবনা তৈরি করবে, যা পরবর্তী কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।



