জাতিসংঘের মুখপাত্র সোমবার ঢাকা শহরের প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠানো হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া জাতিসংঘ স্বয়ংক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষক দল পাঠায় না এবং তাই এই নির্বাচনেও তা প্রযোজ্য নয়। তবে তিনি যোগ করেন, নির্বাচনের সময় জাতিসংঘের দেশীয় অফিস প্রায়ই কারিগরি সহায়তা প্রদান করে থাকে এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে তা চালু আছে কিনা তা পরবর্তীতে জানানো হবে।
ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মুখপাত্রকে বাংলাদেশ সংক্রান্ত তিনটি প্রশ্ন করা হয়। প্রথম প্রশ্নটি ছিল আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনের পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত। তার উত্তরে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “না। সাধারণ পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেট (অনুমোদন) ছাড়া জাতিসংঘ নিজে থেকে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায় না। ফলে আমরা এখন আর এটি করি না।” এরপর তিনি উল্লেখ করেন, “নির্বাচনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘ কান্ট্রি অফিস প্রায়ই কারিগরি সহায়তা দিয়ে থাকে। তারা এ ধরনের কোনো সহায়তা দিচ্ছে কি না, তা আমি আপনাদের জেনে জানাতে পারি।”
দ্বিতীয় প্রশ্নটি জিয়ার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ছিল। মুখপাত্রের মতে, “তাঁর মৃত্যুতে আমরা স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পরিবার ও বাংলাদেশের জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।” এই মন্তব্যে জাতিসংঘের দুঃখ প্রকাশের পাশাপাশি বাংলাদেশে শোকের পরিবেশকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
তৃতীয় প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা এবং ইইউ, অন্যান্য সংস্থার সম্ভাব্য অংশগ্রহণের দিকে ইঙ্গিত করে। যদিও সরাসরি উত্তর দেওয়া হয়নি, পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে দেখা গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশীয় পর্যবেক্ষক দল নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাই জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা ছাড়া, অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বা দেশীয় পর্যবেক্ষক দল থেকে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত হতে পারে।
জাতিসংঘের এই সিদ্ধান্তের পেছনে নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের অভাব স্পষ্ট। নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে সীমাবদ্ধ। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা ব্যবহার করে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে হবে।
অধিকন্তু, জিয়ার মৃত্যুর পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে শোকের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন হিসেবে তার রাজনৈতিক প্রভাব এখনও উল্লেখযোগ্য। তার মৃত্যুর ফলে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সমবেদনা প্রকাশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
অবশ্যই, শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতারা, বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, এই সময়ে দেশের সংহতি বজায় রাখতে এবং শোকের সময়ে জনগণের সঙ্গে সংলাপ বাড়াতে উদ্যোগ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের সমবেদনা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরে শোকের আচার-অনুষ্ঠান ও সমাবেশের পরিকল্পনা চলছে।
নির্বাচনের প্রস্তুতি চলাকালীন, নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের অভাবে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক না পাঠানো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে, জাতিসংঘের দেশীয় অফিসের কারিগরি সহায়তা নির্বাচন প্রক্রিয়ার গুণগত মান উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। এই সহায়তা ভোটার তালিকা আপডেট, প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতি দেশীয় পর্যবেক্ষক ও সিভিল সোসাইটি সংগঠনের ভূমিকা বাড়িয়ে তুলবে। এদিকে, ইইউ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই, নির্বাচনের সময় আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা বজায় রাখতে দেশীয় ও বহিরাগত পর্যবেক্ষকের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।
জাতিসংঘের এই ঘোষণার পর, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কীভাবে পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায় তা নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের অনুপস্থিতিতে নিজেদের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ম্যান্ডেটের অভাবে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে শোকের মুহূর্তে সমবেদনা প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। ভবিষ্যতে কারিগরি সহায়তা ও দেশীয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করার মূল চাবিকাঠি হবে।



