সরকার ৬টি ভিন্ন দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি করে পরিশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয়ের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এই সিদ্ধান্তটি মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে গৃহীত হয়।
বৈঠকে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব বিবেচনা করে, সরকার গি-টু-জি (G2G) ভিত্তিক চুক্তির মাধ্যমে তেল আমদানি নিশ্চিত করার অনুমোদন দেয়। চুক্তির শর্তাবলী বর্তমান বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রিমিয়াম ও রেফারেন্স প্রাইসের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়েছে।
প্রস্তাবিত মোট ব্যয় ১০,৮২৬ কোটি ১১ লাখ টাকা, যা দেশের তেল আমদানি বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ গঠন করে। এই পরিমাণের মধ্যে শিপিং, বীমা, এবং অন্যান্য লজিস্টিক খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা তেল সরবরাহের সময়সূচি ও গুণমান নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
সরকারের সুপারিশকৃত সরবরাহকারী তালিকায় চীনের পেট্রো চায়না ও ইউনিপেক, ভারতের আইওসিএল, থাইল্যান্ডের ওকিউটি, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ইএনওসি, ইন্দোনেশিয়ার বিএসপি এবং মালয়েশিয়ার পিটিএলসিএল অন্তর্ভুক্ত। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃত এবং দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তিতে অভিজ্ঞ।
চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র তেল নয়, মসুর ডাল, গম এবং সয়াবিন তেলসহ কিছু কৃষি পণ্যেরও আমদানি অনুমোদন করা হয়েছে। এই পদক্ষেপটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও তেল সরবরাহের সমন্বিত কৌশলকে শক্তিশালী করতে লক্ষ্য রাখে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই চুক্তি দেশের তেল সরবরাহের স্থিতিশীলতা বাড়াবে এবং আন্তর্জাতিক মূল্যের ওঠানামা থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করবে। দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি মূল্যের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়িয়ে, জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি দমন করতে পারে।
বহিরাগত মুদ্রা ব্যয়ের দিক থেকে দেখা গেলে, এই চুক্তি সরাসরি আমদানি ব্যয়কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে প্রভাব ফেলবে। তবে, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি মাধ্যমে একক লেনদেনের পরিমাণ কমে, লেনদেনের ফি ও রেট ঝুঁকি হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।
কৌশলগতভাবে, সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে তেল সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্য করছে, যা একক দেশ বা সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা কমাবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ার সময়, এই ধরনের বৈচিত্র্যকরণ দেশের শক্তি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক তেল মূল্যের অস্থিরতা এবং চুক্তির মেয়াদ শেষে পুনর্নবীকরণের শর্তাবলী ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। যদি বাজারে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, তবে চুক্তির মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
ভবিষ্যতে, সরকার এই চুক্তির কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করে অতিরিক্ত সরবরাহকারী যুক্ত করা বা চুক্তির শর্তাবলী সমন্বয় করার সম্ভাবনা রাখে। তদুপরি, দেশীয় রিফাইনিং ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য এই আমদানি তেলকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা বাড়াবে।
সংক্ষেপে, সরকার ৬টি দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী গি-টু-জি চুক্তি করে ১০,৮২৬ কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও মসুর ডাল, গম, সয়াবিন তেল বাজারে অনুমোদন করেছে। এই পদক্ষেপটি তেল সরবরাহের স্থিতিশীলতা, মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কদম হিসেবে দেখা হচ্ছে।



