রাশিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ও নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যান দিমিত্রি মেদভেদেভ, জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের বিরুদ্ধে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর মতো অপহরণের সম্ভাবনা উত্থাপন করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র সাড়া পেয়েছেন। মেদভেদেভের মন্তব্য সোমবার জার্মান সরকারের মুখপাত্র সেবাস্টিয়ান হিলের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, যেখানে হিল জার্মানির নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন।
মেদভেদেভের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে গ্রেপ্তার করার অভিযানের পর, বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের ওপর একই রকম অপহরণ পরিকল্পনা করা কল্পনা করা যেতে পারে। তিনি এই ধারণা তুলে ধরে বলেন, মের্ৎসের মতো শাসককে ‘নব্য-নাৎসি’ বলে চিহ্নিত করা এবং তাকে অপহরণ করা বর্তমান আন্তর্জাতিক উত্তেজনার একটি অপ্রত্যাশিত মোড় হতে পারে।
মেদভেদেভ বর্তমানে রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপ-চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন এবং পূর্বে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এই মন্তব্য রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা নীতি ও কূটনৈতিক কৌশলের নতুন দিক উন্মোচন করেছে বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেন।
মেদভেদেভের বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে, জার্মানিতে মের্ৎসের বিরুদ্ধে মামলা চালানোর যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে, ফলে তার ওপর অপহরণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অস্বাভাবিক নয়। তিনি এই যুক্তি দিয়ে ইঙ্গিত দেন যে, আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জার্মানির অভ্যন্তরে মের্ৎসের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।
জার্মান সরকার সোমবার বার্লিনে একটি সংবাদ সম্মেলনে মেদভেদেভের মন্তব্যের প্রতি আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়। মুখপাত্র সেবাস্টিয়ান হিল বলেন, জার্মান সরকার এই ধরনের হুমকি ও উক্তি লক্ষ্য করেছে এবং সেগুলোকে সর্বোচ্চ কঠোর ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকে এমন হুমকি আসলেও জার্মান চ্যান্সেলর সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছেন।
হিলের বক্তব্যে জোর দেওয়া হয়েছে যে, জার্মান সরকার কোনো ধরনের হুমকি বা হস্তক্ষেপকে সহ্য করবে না এবং আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামোর মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপ চালিয়ে যাবে। তিনি উল্লেখ করেন, জার্মানির নিরাপত্তা নীতি ও গৃহস্থালি শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
মেডভেদেভের মন্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ভেনেজুয়েলা অভিযানের প্রভাব রয়েছে। গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলায় একটি অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কে নিয়ে যায়। বর্তমানে মাদুরো ও তার স্ত্রী মাদক পাচার সংক্রান্ত অভিযোগে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে বিচারাধীন।
মাদুরোর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে এবং রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। মেদভেদেভের মন্তব্যকে এই প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমালোচনা করে রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, মেদভেদেভের এই হুমকি জার্মানির নিরাপত্তা নীতি ও ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। যদি রাশিয়া সত্যিই কোনো অপহরণ পরিকল্পনা করে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনি ও কূটনৈতিক পরিণতি বয়ে আনবে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো দেশগুলোর নিরাপত্তা কৌশলে প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে, জার্মানি ইতিমধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখার পাশাপাশি ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। চ্যান্সেলর মের্ৎসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য জার্মান সরকার বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলগুলো সক্রিয় রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি রাশিয়া-জার্মানি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকে ঘুরে গেছে। রাশিয়ার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এই ধরনের উক্তি কূটনৈতিক সংলাপের পরিবর্তে হুমকি ভিত্তিক কৌশলকে নির্দেশ করে, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, মেদভেদেভের অপহরণ হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা অভিযানের পরিণতি জার্মানির নিরাপত্তা নীতি, রাশিয়া-জার্মানি কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর ওপর জটিল প্রভাব ফেলবে। উভয় পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিক্রিয়া এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির দিক নির্ধারণ করবে।



