কুতুবদিয়া জেলেরা ঘন কুয়াশা ও অচিহ্নিত সীমানা যুক্ত বঙ্গোপসাগরে অনিচ্ছাকৃতভাবে ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশের ফলে ধারাবাহিকভাবে ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হচ্ছেন। গত কয়েক মাসে মোট ৮০ জন জেলে এই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছে; বিশেষ করে ১৭ নভেম্বর, ১৯ নভেম্বর, ১ ডিসেম্বর এবং ১৭ ডিসেম্বর বিভিন্ন ফিশিং ট্রলারে আটক হওয়ার ঘটনা রেকর্ডে এসেছে।
সাগরের গভীরতা, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন এবং কুয়াশার প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ-ভারত সীমানা নির্ধারণে ব্যবহৃত বায়ু-দূরত্ব মাপের ফলাফল প্রায়ই ত্রুটিপূর্ণ হয়। ফলে জেলেদের কাছে সীমানা সম্পর্কে যথাযথ ধারণা না থাকায় তারা ভুলবশত ভারতীয় জলসীমায় প্রবেশ করে, যেখানে ভারতীয় নৌবাহিনীর টহলকারী জাহাজ তাদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সংস্থার সভাপতি আবুল কালাম আজাদ উল্লেখ করেন, যদি সাগরে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দূরত্বে বায়ু-দূরত্ব নির্ধারণের জন্য বয়া স্থাপন করা হয়, তবে জেলেদের ভুল প্রবেশের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। এছাড়া ট্রলারে আধুনিক জিপিএস ও রাডার সিস্টেমের ব্যবহারও এই ঝুঁকি হ্রাসে সহায়ক হবে বলে তিনি যুক্তি দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জামশেদ আলম রানা জানান, জেলেদের সীমানা সংক্রান্ত পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায় তারা প্রায়শই ভারতীয় জলে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে আটক হয়। তিনি উল্লেখ করেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভারতের কাকদ্বীপের নিকটবর্তী সীমান্তে জেলেদের জন্য সতর্কতা বাড়িয়ে এবং সমন্বিত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলে ভবিষ্যতে আটক ও হয়রানি রোধ করা সম্ভব। তারা আরও জোর দেন যে, দু’দেশের মধ্যে সমন্বিত সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উভয় দেশের মৎস্যজীবীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
অধিকাংশ আটক জেলেদের বিরুদ্ধে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দ্বারা অপরাধমূলক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে এবং তারা সংশ্লিষ্ট আদালতে উপস্থিত হতে হবে। বর্তমানে আটক জেলেদের জন্য প্রাথমিক শোনানির ব্যবস্থা চলছে; তাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার জন্য উভয় দেশের কূটনৈতিক চ্যানেল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বঙ্গোপসাগরে সীমানা অনির্ধারণের সমস্যাটি সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বয়া স্থাপন ও আধুনিক পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি প্রয়োগের পরিকল্পনা তৈরি করেছে। তদুপরি, মৎস্যজীবীদের জন্য সীমানা সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে উভয় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল বাড়ানো, ট্রলারের চলাচল সময়সূচি ও জোয়ার-ভাটার তথ্যের সঠিক ব্যবহার, এবং মৎস্যজীবীদের জন্য সীমানা চিহ্নিতকরণে সহায়ক সরঞ্জাম সরবরাহ করা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন।
সামগ্রিকভাবে, সীমানা অনির্ধারণের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তাহীনতা কুতুবদিয়া জেলেদের জীবিকা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। যথাযথ সীমানা চিহ্নিতকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন এবং দ্বিপাক্ষিক সমন্বয় এই সমস্যার সমাধানে মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই পদক্ষেপগুলো কার্যকর হলে জেলেদের অবৈধভাবে আটক হওয়া কমে যাবে এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত হবে।



