ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অর্থ উপদেষ্টা, মঙ্গলবার সরকারী ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভা শেষে জানালেন যে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনা দেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কোনো প্রভাব ফেলবে না। তিনি এই মন্তব্য সরকারী সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সভার পর প্রকাশ করেন, যেখানে বিভিন্ন সরকারি ক্রয় নীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আলোচনা করা হয়।
সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে ক্রীড়া ক্ষেত্রের একটি ঘটনা তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে; ক্রিকেটার মুস্তাফিজের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনা উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাতের মতো দেখা দিয়েছে। ড. আহমেদ উল্লেখ করেন, এই ঘটনার শুরুর দায়িত্ব বাংলাদেশে নয় এবং তা দু’দেশের সম্পর্কের মূল কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না।
উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকলেও বাণিজ্যিক লেনদেনের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভিত্তি শক্তিশালী এবং তা কোনো রাজনৈতিক অশান্তির দ্বারা নষ্ট হবে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, উভয় সরকার বিষয়টি সমাধানের জন্য সরাসরি আলোচনায় যুক্ত হবে।
ড. আহমেদ আরও উল্লেখ করেন, দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি কোনোভাবেই কাম্য নয়; তবে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে তা ঘটতে না দেওয়া উচিত। তিনি দু’দেশের নেতৃত্বকে আহ্বান জানান যে, সমস্যার সমাধানকে দ্রুততর করতে সরাসরি সংলাপের পথ অনুসরণ করা হোক, যাতে বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল থাকে।
একই সময়ে তিনি জানিয়ে দেন যে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে সম্পন্ন হবে। এই কাঠামোগত সংস্কারটি কর সংগ্রহের দক্ষতা বাড়াতে এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজ করতে লক্ষ্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করবে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক পরিসংখ্যান দেখায় যে, দুই দেশের মধ্যে মোট বাণিজ্যিক লেনদেনের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি ভারত থেকে আসে। রপ্তানি-আমদানি উভয় ক্ষেত্রেই ভারত প্রধান অংশীদার, বিশেষ করে জ্বালানি, রেলওয়ে, সড়ক নির্মাণ এবং কৃষি পণ্যের ক্ষেত্রে। তাই রাজনৈতিক উত্তেজনা যদি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তা সরাসরি রপ্তানি-আমদানি প্রবাহে প্রভাব ফেলতে পারে। ড. আহমেদের আশ্বাস এই ঝুঁকি কমিয়ে দেয় এবং বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাস বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রাজনৈতিক ঝুঁকি হ্রাসের সংকেত শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানি-নির্ভর শিল্প, লজিস্টিকস এবং সাপ্লাই চেইন সংযুক্ত কোম্পানিগুলো এই ধরনের মন্তব্যকে ইতিবাচক সূচক হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে, শেয়ার মূল্যে সাময়িক স্থিতিশীলতা এবং নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ বাড়তে পারে।
তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেন, যদি উত্তেজনা দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকে, তবে সীমান্ত পারাপার পণ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং ট্রান্সপোর্ট লজিস্টিকসে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে রেলওয়ে ও সড়ক সংযোগের ওপর নির্ভরশীল শিল্পগুলোতে সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাতের সম্ভাবনা থাকে। তাই সরকারকে কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি বাণিজ্যিক চ্যানেলগুলোকে বিকল্প রুটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা জরুরি।
সারসংক্ষেপে, ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক সম্পর্কের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। তিনি দুই দেশের মধ্যে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন এবং আর্থিক সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের জন্য এটি একটি স্থিতিশীলতা সংকেত, তবে দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক সমাধান না হলে সীমান্ত পারাপার লজিস্টিকসে ঝুঁকি রয়ে যাবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, নীতি নির্ধারক ও শিল্পখাতের নেতাদের উভয়েরই সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে বাণিজ্যিক প্রবাহে কোনো বাধা না আসে এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধির গতি বজায় থাকে।



