ঢাকার ৬৪ বছর বয়সী খালিল আহমেদ খান, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা ও ওষুধের জন্য টাকার প্রয়োজন। তিনি অবিভা ফাইন্যান্স লিমিটেডে ২৩ লক্ষ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রেখেছিলেন, যা জানুয়ারি ২১ তারিখে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি মাত্র ৮.৯৮ লক্ষ টাকা পেয়েছেন, বাকি অর্থ এখনও অপ্রাপ্ত।
কহনের দাবি, তিনি অবিভা ফাইন্যান্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টরের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে বাকি টাকা দাবি করেন, কিন্তু কয়েক মাসের পরও কোনো ফেরত পাননি। তার স্বাস্থ্য ব্যয় এবং ঋণ পরিশোধের জরুরি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে, তিনি উল্লেখ করেন যে বাকি অর্থ না পেলে তার চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হবে।
কহনের মতোই দেশের বহু নন‑ব্যাংক ডিপোজিটর তাদের সঞ্চয় পুনরুদ্ধারের জন্য বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দরজায় হাত তোলেন। এই গোষ্ঠীর মধ্যে বয়স্ক নাগরিক, স্বনিয়োজিত কর্মী এবং ছোট ব্যবসায়ী অন্তর্ভুক্ত, যারা প্রায়ই উচ্চ সুদের হার ও সহজ শর্তের কারণে নন‑ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি নয়টি সমস্যাযুক্ত নন‑ব্যাংক ফিনান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (এনবিএফআই) লিকুইডেট করার সিদ্ধান্ত জানায়। এই পদক্ষেপের ফলে অবিভা ফাইন্যান্সসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও জমাকারীদের উদ্বেগ বাড়ে। লিকুইডেশন ঘোষণার আগে এই সংস্থাগুলোতে জমা রাখা সঞ্চয়কারীরা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
লিকুইডেটের তালিকায় রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফেয়ারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অবিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এই সংস্থাগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তহবিল সংগ্রহে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে এবং নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে কঠোর পদক্ষেপের মুখে।
নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপের ফলে শেয়ারবাজারে নন‑ব্যাংক সেক্টরের শেয়ার মূল্যে তীব্র পতন দেখা যায়। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমাতে অন্যান্য সেক্টরে রূপান্তরিত হচ্ছেন, ফলে আর্থিক বাজারের তরলতা হ্রাস পায়। একই সঙ্গে, ডিপোজিটরদের আস্থা হ্রাস পেয়ে নতুন জমা সংগ্রহের ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত বেসরকারি খাতের কর্মচারী, যিনি অবিভা ফাইন্যান্সে ৮০ লক্ষ টাকার ডিপোজিট রেখেছেন, তার স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য তহবিল তোলার প্রয়োজনীয়তা প্রকাশ করেছেন। তবে কোম্পানির আর্থিক সংকটের কারণে তিনি এখনো অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন না, যা তার চিকিৎসা পরিকল্পনাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
অবিভা ফাইন্যান্সের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও মোহাম্মদ মোদাস্সার হাসানের সঙ্গে ফোন ও টেক্সটের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি। এই যোগাযোগের ঘাটতি ডিপোজিটরদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে এবং সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, নন‑ব্যাংক সেক্টরের এই ধরনের সংকট আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে যখন বৃহৎ পরিমাণের জনসাধারণের সঞ্চয় একসাথে আটকে যায়। তদুপরি, ব্যাংকিং সিস্টেমের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে যদি ডিপোজিটররা ব্যাংকে রূপান্তরিত হয়ে তহবিল প্রত্যাহার করতে শুরু করে।
ভবিষ্যতে, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা জরুরি, যাতে নন‑ব্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয়কারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার হয়। একই সঙ্গে, ডিপোজিটরদের জন্য বিকল্প সঞ্চয় পণ্যের বিকাশ এবং ঝুঁকি প্রশমনের জন্য যথাযথ বীমা কাঠামো গঠন করা প্রয়োজন। এই পদক্ষেপগুলো না নেওয়া হলে নন‑ব্যাংক সেক্টরের পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদে বিলম্বিত হতে পারে।



