শের-ই-বাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে সোমবার (৫ ডিসেম্বর) পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদ উদ্দিনের নেতৃত্বে দুই লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) সংশোধন করে চূড়ান্ত করা হয়। এতে মোট ৭২ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ এবং সরকারের কোষাগার থেকে এক লাখ ২৮ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সংশোধিত এডিপি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ৭৪ শতাংশ কাটছাঁট দেখায়। শিক্ষা, পরিবহন, ধর্ম ও কৃষি ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য হ্রাস ঘটেছে, তবে পরিবেশ, স্থানীয় সরকার এবং বিজ্ঞান‑প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় ১২ জানুয়ারি সংশোধিত এডিপি অনুমোদনের প্রস্তাব থাকবে বলে জানানো হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের এক সচিবের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বড় কাটছাঁটের প্রধান কারণ হল সরকারের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য প্রকল্প বাতিল হয়ে প্রকল্পভিত্তিকভাবে রূপান্তরিত হওয়া। প্রকল্পের অগ্রগতি না থাকায় ব্যয় করা সম্ভব না হওয়ায় বরাদ্দ কমে গেছে।
২০২৫-২৬ এডিপি এবং সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) তুলনা করলে শীর্ষ ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বরাদ্দের পার্থক্য স্পষ্ট দেখা যায়। পানির সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ২৮ শতাংশ বাড়লেও, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট সর্বোচ্চ ৭৭ শতাংশ কমে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ৭৩ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ, প্রাথমিক শিক্ষায় ২৯ শতাংশ, নৌপরিবহনে ৩৬ শতাংশ এবং রেলপথ ও কৃষিতে সমানভাবে ৩৬ শতাংশ কাটছাঁট হয়েছে।
সেক্টরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আরএডিপিতে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের কাটছাঁট সবচেয়ে বড়। অন্যদিকে, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার এবং বিজ্ঞান‑প্রযুক্তি বিভাগে বরাদ্দ বাড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই পরিবর্তনগুলো সরকারী নীতি ও অগ্রাধিকার পুনর্গঠনের ইঙ্গিত দেয়।
অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারকদের মতে, বাজেটের এই পুনর্বণ্টন দেশের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যাপক হ্রাস সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হতে পারে। পরবর্তী ধাপে, সংশোধিত এডিপি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের অনুমোদন পাবে, যা সংসদে আলোচনার পরিধি নির্ধারণ করবে।
এই বাজেট পরিবর্তনগুলো দেশের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব ফেলবে। স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত তহবিলের অভাব গ্রামীণ ও নগর এলাকায় সেবা মান হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে। অন্যদিকে, পরিবেশ ও বিজ্ঞান‑প্রযুক্তি খাতে তহবিল বৃদ্ধি গবেষণা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সীমিত সম্পদকে সর্বাধিক কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে এই ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নতুন প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য ত্বরান্বিত করতে হবে, যাতে কাটছাঁটের প্রভাব কমিয়ে আনা যায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে আরএডিপি বাস্তবায়নের সময় সরকারী অগ্রাধিকার ও জনমত কীভাবে সামঞ্জস্য হবে তা পর্যবেক্ষণ করবেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে কাটছাঁটের ফলে সামাজিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্কে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা রাজনৈতিক আলোচনার মূল বিষয় হয়ে উঠবে।



