নেটফ্লিক্স ভিয়েতনাম প্ল্যাটফর্ম থেকে চীনের রোমান্স সিরিজ ‘শাইন অন মি’ অপসারণ করেছে, কারণ হ্যানয় সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এক এপিসোডে প্রদর্শিত দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত মানচিত্রের জন্য আপত্তি জানায়।
এই নাটকটি মোট ২৭টি পর্বের একটি রোমান্টিক সিরিজ, যা চীন এবং অন্যান্য এশীয় দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। নেটফ্লিক্সের তালিকায় এটি সিঙ্গাপুর, তাইওয়ান এবং ভিয়েতনামসহ বেশ কয়েকটি দেশে শীর্ষ দশের মধ্যে স্থান পেয়েছিল। তবে মানচিত্রের বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পর ভিয়েতনামীয় দর্শকদের জন্য তা আর উপলব্ধ নয়।
বিতর্কের মূল কারণ হল এপিসোড ২৫-এ একটি লেকচার দৃশ্যে চীনের মানচিত্রে ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দেখা যায়, যা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের দাবি চিহ্নিত করে। এই রেখা ভিয়েতনামসহ ফিলিপাইন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইয়ের মতো দেশগুলোর ভূখণ্ডীয় স্বার্থের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। ভিয়েতনামীয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ৩ জানুয়ারি এই বিষয়টি তুলে ধরে নেটফ্লিক্সকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সিরিজটি মুছে ফেলতে নির্দেশ দেয়।
মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর নেটফ্লিক্স দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সিরিজটি ভিয়েতনামীয় স্ট্রিমিং সেবা থেকে সরিয়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পরপরই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা বিএসসি একটি যাচাই করে জানায় যে, এখন আর ভিয়েতনামের নেটফ্লিক্স অ্যাপে ‘শাইন অন মি’ দেখা যায় না।
চীনের পক্ষ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে কোনো সরকারি মন্তব্য প্রকাশিত হয়নি। তবে চীনের রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের একটি প্রতিবেদনে হ্যানয়কে আহ্বান জানানো হয়েছে যে, সাংস্কৃতিক বিনিময়কে দক্ষিণ চীন সাগরের ভূখণ্ডীয় বিরোধ থেকে আলাদা রাখা উচিত। এই মন্তব্যটি বিষয়টির রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা তুলে ধরে।
‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ চীনের মানচিত্রে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত একটি চিহ্ন, যা দক্ষিণ চীন সাগরের বেশিরভাগ অংশকে চীনের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে। এই দাবি ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাইসহ বহু দেশের বিরোধের মূল বিষয়। এই দেশগুলো তাদের নিজস্ব সামুদ্রিক সীমা ও সম্পদ রক্ষার জন্য চীনের দাবিকে অবৈধ বলে গণ্য করে।
গত কয়েক বছরে চীন এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি বাড়াতে বিভিন্ন ধাপ অনুসরণ করেছে। কৃত্রিম দ্বীপ গড়ে তোলা, সামরিক সুবিধা স্থাপন এবং নিয়মিত নৌবাহিনীর পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে চীন তার দাবিকে বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। এমন কিছু সময়ে এই কার্যক্রম ফিলিপাইনের নৌবাহিনীর সঙ্গে তীব্র সংঘর্ষের দিকে নিয়ে গেছে।
চীনের ঐতিহাসিক দাবি সমর্থন করার জন্য বিভিন্ন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে, যেমন প্রাচীন মাটির পাত্র, নৌযাত্রা নির্দেশিকা এবং চীনা মৎস্যজীবীদের ঐতিহ্যবাহী রুট। তবে আন্তর্জাতিক আইনি পরিপ্রেক্ষিতে এই প্রমাণগুলোকে যথেষ্ট প্রমাণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। ২০১৬ সালে হেগের আন্তর্জাতিক আদালত চীনের দক্ষিণ চীন সাগরের অধিকাংশ দাবি অস্বীকার করে একটি রায় প্রদান করে, যা চীনের ভূখণ্ডীয় দাবিকে বৈধতা থেকে বাদ দেয়।
এই রায়ের পরেও চীন তার ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই ভিয়েতনামীয় সরকার এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে চীনের মানচিত্রের এই চিহ্নকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না বলে সমালোচনা করে।
‘শাইন অন মি’ সিরিজের এই ঘটনার ফলে নেটফ্লিক্সের সাংস্কৃতিক কন্টেন্ট নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নিয়ে নতুন আলোচনার দরজা খুলে গেছে। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এখন কন্টেন্টের ভৌগোলিক প্রকাশের আগে স্থানীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনা করতে বাধ্য হচ্ছে।
ভিয়েতনামীয় দর্শকদের জন্য এই নাটকটি আর দেখা সম্ভব না হলেও, এই ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও বিনোদন শিল্পে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে কন্টেন্ট নির্মাতা ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভূ-রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে, যাতে সাংস্কৃতিক বিনিময়কে অপ্রয়োজনীয় বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তরিত না করা যায়।



