ঢাকা: মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অনুমোদিত অদৃশ্যতার ব্যাপক তদন্তের জন্য গঠিত কমিশন অব ইনকোয়ারি অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সস (CIED) গতকাল তার চূড়ান্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB) সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার জড়িততা প্রকাশ করে, এবং আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপক সুপারিশ দেয়।
কমিশনের চেয়ারম্যান জাস্টিস ময়ীনুল ইসলাম চৌধুরী উল্লেখ করেন, তদন্তে মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় এক-চতুর্থাংশের বেশি অভিযোগে রাবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যা মোট অভিযোগের প্রায় ২৫% গঠন করে। পুলিশ ২৩% এবং ডিটেকটিভ শাখা ১৪.৫% অভিযোগে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (CTTC), ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (DGFI) এবং ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্স (NSI) সহ অন্যান্য সংস্থার নামও উল্লেখিত।
কমিশনের মতে, এই সংস্থাগুলোর দ্বারা পরিচালিত অদৃশ্যতা “প্রণালীগত ও সংস্থাগত”ভাবে ঘটছে, যা বিচ্ছিন্ন ঘটনার বদলে সমন্বিত রাষ্ট্রিক নীতি নির্দেশ করে। এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসহ বহু নাগরিক অদৃশ্য হয়ে গেছেন, যার মধ্যে ৭৫% অদৃশ্যতার শিকারী জামায়াতে-শিবিরের সদস্য এবং ৬৮% এখনও নিখোঁজ ব্যক্তি বিএনপি-সংযুক্ত।
প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে রাবের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি অন্যতম। এছাড়া, সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরীণ আইন প্রয়োগে অংশগ্রহণ বন্ধ করা, ২০০৯ সালের অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্টের সংশোধন বা বাতিল করা, এবং আরপিবি আইন ২০০৩-এর ধারা ১৩ রদ করা অন্তর্ভুক্ত। নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য মানবাধিকার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা, ভিক্টিম-সেন্ট্রিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা এবং ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত আটকস্থলগুলোকে সত্য ও দায়বদ্ধতার স্মারক জাদুঘরে রূপান্তর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ক counterterrorism নীতি গ্রহণের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় স্তরে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমকে সমর্থন করবে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মান অনুসারে একটি ব্যাপক ডিএনএ ডাটাবেস গঠন করে অদৃশ্যদের পরিচয় নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই ডাটাবেসের মাধ্যমে পরিবারগুলোকে দ্রুত সনাক্তকরণ ও আইনি প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা সম্ভব হবে।
কমিশনের সুপারিশগুলো এখন সরকারী অনুমোদনের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে প্রস্তাবিত আইনসভার সংশোধন, নিরাপত্তা সংস্থার কাঠামো পুনর্গঠন এবং মানবাধিকার প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনসভার অনুমোদন ও কার্যকরী পদক্ষেপের পরেই রাবের বিলুপ্তি এবং অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার ভূমিকা পুনর্নির্ধারণ সম্ভব হবে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন না হলে অনুমোদিত অদৃশ্যতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের চক্র অব্যাহত থাকবে। অতএব, সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আইনগত কাঠামোকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
অধিকন্তু, কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখিত ডিএনএ ডাটাবেসের নির্মাণে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা প্রযুক্তিগত দিক থেকে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে অদৃশ্যদের পরিবারগুলোকে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে এবং সমাজে বিশ্বাস পুনর্স্থাপন হবে।
সারসংক্ষেপে, কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুমোদিত অদৃশ্যতার ব্যাপকতা ও দায়িত্বের স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরেছে, এবং রাবের বিলুপ্তি, নিরাপত্তা সংস্থার পুনর্গঠন, আইন সংশোধন ও মানবাধিকার প্রশিক্ষণসহ বহু সংস্কারমূলক পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। সরকারী অনুমোদন ও দ্রুত বাস্তবায়নই এই সমস্যার সমাধানের মূল চাবিকাঠি হবে।



