মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্ত্য নাডেলা সম্প্রতি নিজের ব্লগে লিখে বলেছেন যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আর ‘স্লপ’ হিসেবে অবমূল্যায়ন করা উচিত নয়; বরং এটিকে ‘মনের সাইকেল’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যা মানব চিন্তার গতি বাড়িয়ে দেয়। এই মন্তব্যটি মেরি-ওয়েবস্টার কর্তৃক ‘স্লপ’ শব্দকে বছরের শব্দ হিসেবে ঘোষণা করার কয়েক সপ্তাহ পর প্রকাশিত হয়। নাডেলা জোর দিয়ে বলেছেন যে AI-কে মানব সম্ভাবনার সহায়ক কাঠামো হিসেবে দেখা দরকার, প্রতিস্থাপন নয়।
তিনি ‘মনের সাইকেল’ রূপকটি ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে সাইকেল শারীরিক গতিকে বাড়ায়, তেমনি AI মনের কাজকে ত্বরান্বিত করে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে AI-কে এমন একটি সরঞ্জাম হিসেবে দেখা উচিত, যা মানুষের সৃজনশীলতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়ায়, নিজে থেকে কাজ করে না। নাডেলা উল্লেখ করেছেন যে AI-কে মানবের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং মানবের সম্ভাবনা প্রসারিত করার সোপান হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
তিনি ‘স্লপ বনাম পরিশীলন’ বিতর্ককে অতিক্রম করে নতুন মানসিক সমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, ভবিষ্যতে মানুষ AI-কে এমন একটি মানসিক সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহার করবে, যা পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে গঠন করবে। এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে মানব ও মেশিনের মধ্যে সহযোগিতা আরও সুগম হবে।
নাডেলা প্রযুক্তি শিল্পকে আহ্বান জানিয়েছেন যে AI-কে আর মানবের বদলে কাজ করার উপায় হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সহায়ক হিসেবে প্রচার করা উচিত। তিনি উল্লেখ করেছেন যে বর্তমানের অনেক AI পণ্যের বিপণন কৌশল এখনও মানব শ্রমের প্রতিস্থাপনকে মূল বিক্রয় পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে। এই পদ্ধতি মূল্য নির্ধারণকে উচ্চতর করে এবং AI-কে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করে।
বিপণন কৌশলের এই প্রবণতা AI-কে মানব কাজের বিকল্প হিসেবে দেখিয়ে বাজারে তার মূল্য বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। তবে নাডেলা বিশ্বাস করেন যে অধিকাংশ AI টুল বর্তমানে ব্যবহারকারীর সহায়তায় কাজ করে, যদি ব্যবহারকারী ফলাফল যাচাই করে নেয়।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষেত্রের কিছু শীর্ষ নেতার কাছ থেকে চাকরি হারানোর ভয় শোনা যায়। অ্যানথ্রপিকের সিইও ডারিও আমোডেই সম্প্রতি সতর্ক করেছেন যে AI প্রাথমিক স্তরের সাদা কলার চাকরির অর্ধেক পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে, ফলে আগামী পাঁচ বছরে বেকারত্বের হার ১০ থেকে ২০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তিনি এই উদ্বেগটি সম্প্রতি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে পুনরায় প্রকাশ করেছেন।
এই ধরনের চরম পূর্বাভাসের সঠিকতা এখনও নিশ্চিত নয়; বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষণ ভিন্ন ফলাফল দেখাচ্ছে। তাই AI-র কর্মসংস্থান উপর প্রভাব নিয়ে মতবিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউটের চলমান প্রকল্প ‘আইসবার্গ’ এই বিষয়টি গভীরভাবে গবেষণা করছে। এই প্রকল্পটি AI-র কর্মবাজারে প্রবেশের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিবর্তন পরিমাপের জন্য ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। গবেষকরা AI-কে সহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার করা এবং সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন করা দুটোই আলাদা করে মূল্যায়ন করছেন।
প্রকল্পের প্রাথমিক ফলাফল নির্দেশ করে যে অধিকাংশ AI সেবা বর্তমানে ব্যবহারকারীর সহায়তায় কাজ করে, এবং ব্যবহারকারীকে ফলাফল যাচাই করতে হয়। তাই AI-কে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সমাধান হিসেবে নয়, বরং মানবের কাজকে ত্বরান্বিত করার উপকরণ হিসেবে দেখা যুক্তিযুক্ত।
নাডেলার দৃষ্টিভঙ্গি ও আইসবার্গের গবেষণা উভয়ই এই ধারণা সমর্থন করে যে AI বর্তমানে মানব শ্রমের বিকল্প নয়, বরং সহযোগী। এই সমন্বয় ভবিষ্যতে AI-র নীতি ও বাজার কৌশলকে প্রভাবিত করতে পারে।
যদি AI সত্যিই ‘মনের সাইকেল’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক বেকারত্বের ঝুঁকি কমে যাবে। এই পরিবর্তন কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নতুন কাজের সৃষ্টিতে সহায়তা করতে পারে।
নাডেলার আহ্বান প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জন্য একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করে: AI পণ্যের নকশা, মূল্য নির্ধারণ ও যোগাযোগে মানব সহায়ক দিককে জোর দিয়ে বাজারে প্রবেশ করা উচিত। এভাবে AI-কে মানবের বিকল্পের বদলে মানবের ক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে গৃহীত করা সম্ভব হবে।



