যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত রোববার নিজের সামাজিক নেটওয়ার্ক ‘ট্রুথ সোশ্যাল’‑এ ১২০টি দেশ ও অঞ্চলের অভিবাসী পরিবারগুলোর সরকারি সহায়তা গ্রহণের হার প্রকাশ করেন। তালিকায় বাংলাদেশ ১৯তম স্থানে অবস্থান করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি পরিবারগুলোর ৫৪.৮ শতাংশ সরকারী কল্যাণসেবা ব্যবহার করে। এই তথ্য ‘ইমিগ্র্যান্ট ওয়েলফেয়ার রেসিপিয়েন্ট রেটস বাই কান্ট্রি অব অরিজিন’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর অবস্থানও তালিকায় উল্লেখিত, যেখানে ভুটানের অভিবাসী পরিবারগুলোর ৮১.৪ শতাংশ সর্বোচ্চ হার নিয়ে রয়েছে। আফগানিস্তান ষষ্ঠ স্থানে, ৬৮.১ শতাংশ পরিবার কল্যাণসেবা গ্রহণ করে। পাকিস্তান ৬০তম স্থানে, ৪০.২ শতাংশ পরিবার এবং নেপাল ৯০তম স্থানে, ৩৪.৮ শতাংশ পরিবার এই সেবা পায়। ভারতের ও শ্রীলঙ্কার নাম তালিকায় না থাকায় বোঝা যায়, তাদের পরিবারগুলো তুলনামূলকভাবে কম সহায়তা গ্রহণ করে।
যুক্তরাষ্ট্রের অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত দুই দশকে বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বিশাল বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০০ সালে মাত্র ৪০,০০০ পরিবার ছিল, আর ২০২৩ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ২,৭০,০০০-এ পৌঁছেছে, যা ৫৬৯ শতাংশের উর্ধ্বগতি নির্দেশ করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আর্থিক অবস্থার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।
২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাংলাদেশি পরিবারের গড় বার্ষিক আয় প্রায় ৭৮,৪০০ ডলার। একই সময়ে, এশীয় পরিবারগুলোর গড় আয় ১,১৫,৬০০ ডলার, যা উল্লেখযোগ্য পার্থক্য সৃষ্টি করে। ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষেত্রে, বাংলাদেশি গড়ে ৩৫,৪০০ ডলার উপার্জন করে, যেখানে এশীয় গড় ৫২,৪০০ ডলার। এই আয় বৈষম্য দারিদ্র্যের হারেও প্রভাব ফেলছে।
পিউ রিসার্চের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত এশীয়দের সামগ্রিক দারিদ্র্যের হার ১০ শতাংশ, তবে বাংলাদেশিদের এই হার ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ দারিদ্র্যের মাত্রা সম্ভবত সরকারী সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে, অধিকাংশ বাংলাদেশি পরিবার কল্যাণসেবা গ্রহণের দিকে ঝুঁকেছে, যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
এই তথ্যের প্রতি কিছু বিশ্লেষক যুক্তি দেন যে, সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়লে অভিবাসী সম্প্রদায়ের স্বনির্ভরতা হ্রাস পেতে পারে। অন্যদিকে, আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখে এই সহায়তা পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উভয় দৃষ্টিকোণই বাংলাদেশি ডায়াস্পোরার ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি গঠনে এই পরিসংখ্যানের প্রভাবও অনস্বীকার্য। সরকারী সহায়তার উচ্চ গ্রহণ হারকে বিবেচনা করে, ভবিষ্যতে ভিসা ও স্থায়ী বসবাসের শর্তে পরিবর্তন আনা হতে পারে। বিশেষ করে, উচ্চ দারিদ্র্য হারযুক্ত গোষ্ঠীর জন্য সহায়তার মানদণ্ড কঠোর করা বা স্বয়ংসম্পূর্ণতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের নেতা ও সংগঠনগুলোও এই তথ্যের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। তারা কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবারের আয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে, যাতে কল্যাণসেবার ওপর নির্ভরতা কমে। একই সঙ্গে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সরকার ও সামাজিক সেবার সঙ্গে সমন্বয় করে সম্প্রদায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোও এই তথ্যকে ভোটার ভিত্তি গঠনে ব্যবহার করতে পারে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টি সামাজিক কল্যাণের সম্প্রসারণের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে, যেখানে রিপাবলিকান পার্টি সহায়তার শর্ত কঠোর করার দাবি উত্থাপন করতে পারে। ফলে, বাংলাদেশি ভোটারদের ভোটের প্রবণতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর নতুন দৃষ্টিকোণ তৈরি হতে পারে।
প্রতিবেদনটি উল্লেখ করে যে, ভবিষ্যতে পিউ রিসার্চের মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো এই ধরণের তথ্য নিয়মিত আপডেট করবে, যাতে নীতি নির্ধারক ও জনসাধারণের জন্য স্বচ্ছতা বজায় থাকে। ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যাবে, কোন কোন অঞ্চল বা পেশায় বাংলাদেশি পরিবারগুলো বেশি আয় অর্জন করছে এবং কোন ক্ষেত্রে সহায়তা প্রয়োজন।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পরিবারগুলোর সরকারি সহায়তা গ্রহণের হার ৫৪.৮ শতাংশ, যা দেশের ১৯তম স্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে, আর্থিক সূচকগুলো দেখায় যে, এই গোষ্ঠী এশীয় গড়ের তুলনায় কম আয় এবং উচ্চ দারিদ্র্য হার বহন করে। এই বাস্তবতা সরকারী নীতি, সামাজিক সংহতি এবং সম্প্রদায়ের স্বনির্ভরতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
অবশেষে, এই তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশি ডায়াস্পোরা কীভাবে আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণ নীতি কীভাবে পরিবর্তিত হবে, তা আগামী বছরগুলিতে পর্যবেক্ষণযোগ্য হবে।



