ভেনেজুয়েলা জাতীয় সমাবেশ সোমবার ডেলসি রড্রিগেজকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ করায়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে নিউ ইয়র্কে ড্রাগ ট্রায়ালের জন্য পাঠানোর দুই দিন পরের ঘটনা। রড্রিগেজ, যিনি পূর্বে মাদুরোর ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন, শপথের সময় বললেন তিনি দেশের সকল নাগরিকের নামে দায়িত্ব গ্রহণ করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক।
শপথ অনুষ্ঠানে রড্রিগেজ উল্লেখ করেন, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘হিরো’ হিসেবে বিবেচনা করে তাদের গ্রেফতারের ওপর গভীর দুঃখ প্রকাশ করেন, এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের আটককে ‘অধিগ্রহণ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে দেশের স্বার্থ রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতীয় সমাবেশের সদস্যরা রড্রিগেজের শপথকে সমর্থন জানিয়ে তার নেতৃত্বে সম্পূর্ণ একতার আহ্বান জানায়। একই সময়ে, রড্রিগেজের ভাই জর্জ রড্রিগেজকে পার্লামেন্টের স্পিকার হিসেবে পুনর্নির্বাচন করা হয়, যা শাসন কাঠামোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।
সেশনের উদ্বোধনে আইনসভার সদস্যরা “লেটস গো নিকো!” চিৎকার করে মাদুরোর ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্টীয় প্রচারাভিযানের স্লোগান পুনরায় উত্থাপন করে, যদিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দেশীয় বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনকে জালিয়াতিপূর্ণ বলে সমালোচনা করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আদেশে শনিবার সকালে ভেনেজুয়েলা রাজধানী কারাকাসে সামরিক আক্রমণ চালানো হয়, যার ফলে মাদুরো ও সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতার করে নিউ ইয়র্কে ড্রাগ ট্রেডিং অভিযোগে বিচারাধীন করা হয়। এই আক্রমণকে ভেনেজুয়েলার সরকার ‘অধিকৃত’ হিসেবে বর্ণনা করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক সৃষ্টি করে।
সদস্য আইনসভার প্রবীণ প্রতিনিধি ফার্নান্দো সোটো রোজাস শাসনের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্প নিজেকে বিশ্বব্যাপী ‘প্রসিকিউটর, বিচারক ও পুলিশ’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন, যা ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের প্রতি আক্রমণ। তিনি যুক্তি দেন, ট্রাম্পের এই দাবি সফল হবে না এবং ভেনেজুয়েলার জনগণ ও সরকার একত্রে বৈধ প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রত্যাবর্তনের জন্য সম্পূর্ণ সমর্থন প্রদান করবে।
ডেলসি রড্রিগেজের শপথের পর পার্লামেন্টের আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় মাদুরোর গ্রেফতারের নিন্দা করা হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তার মুক্তি ও দেশের স্বায়ত্তশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। সরকার জোর দিয়ে বলেছে, এই সময়ে দেশীয় শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে সকল রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয় প্রয়োজন।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, রড্রিগেজের অস্থায়ী প্রেসিডেন্সি দেশের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। তিনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখেন, তবে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা হ্রাস এবং তেল রপ্তানি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো রড্রিগেজের শাসনকে মাদুরোর শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন ছাড়া বৈধতা অর্জন কঠিন হবে বলে সতর্কতা জানায়। তারা দাবি করে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পুনর্স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়।
মাদুরোর গ্রেফতার ও রড্রিগেজের শপথের পর ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। তেল মূল্যের ওঠানামা, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি বিনিয়োগের হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ে। সরকার এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তেল রপ্তানি নীতি পুনর্বিবেচনা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা সম্পর্কে সরকার ও বিরোধী উভয় পক্ষই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দেয়। রড্রিগেজের শাসনকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশীয় ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক গতিবিধি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে, এবং মাদুরোর সম্ভাব্য মুক্তি বা শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে।
এই ঘটনাগুলো ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ একসঙ্গে প্রকাশ পায়। রড্রিগেজের শপথের পর দেশীয় শাসনব্যবস্থা কীভাবে পুনর্গঠন হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে পুনঃনির্ধারিত হবে, তা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে মূল ভূমিকা রাখবে।



