বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মানসুর রাশিদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে যে, রমজান মাসের আগে, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, নন‑ব্যাংক ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন (এনবিএফআই) থেকে জমা রাখা ব্যক্তিগত সঞ্চয়কারীরা তাদের মূলধন পুনরুদ্ধার করতে পারবেন। এই পদক্ষেপটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মানসুর উল্লেখ করেন, দেউলিয়া ঘোষণার আইনি প্রক্রিয়া এই সপ্তাহেই আরম্ভ হবে। প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে অযোগ্য ঘোষণা করে সম্পদের মূল্যায়ন করা হবে।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ডিসেম্বর ২০২৪-এ গৃহীত ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫, যা দেশের প্রথম সমন্বিত দেউলিয়া সমাধান কাঠামো। এই আইন অনুযায়ী, আর্থিক ক্ষতি সীমিত করতে এবং জমাকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে দ্রুত দেউলিয়া প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
দেউলিয়া ঘোষণার অধীনস্থ নয়টি এনবিএফআই হল: এফএএস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি, প্রিমিয়ার লিজিং, ফেয়ারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। এই প্রতিষ্ঠানগুলো গত বছর আর্থিক দুর্বলতার কারণে বন্ধের পথে ধাবিত হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই নয়টি সংস্থার মোট জমা টাকার পরিমাণ প্রায় টাকার ১৫,৩৭০ কোটি, যার মধ্যে ব্যক্তিগত সঞ্চয়কারীর অংশ প্রায় টাকার ৩,৫২৫ কোটি এবং ব্যাংক ও কর্পোরেট ক্লায়েন্টের অংশ টাকার ১১,৮৪৫ কোটি। এই বিশাল পরিমাণের মধ্যে ব্যক্তিগত জমা অংশই প্রধানত রমজান আগে ফেরত পাওয়ার লক্ষ্য।
সরকারের মুখে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় টাকার ৫,০০০ কোটি ব্যক্তিগত জমাকারীদের পুনরুদ্ধারের জন্য অনুমোদিত হয়েছে। এই তহবিলের ব্যবহার সরাসরি দেউলিয়া সংস্থার সম্পদ বিক্রয় ও নগদীকরণের মাধ্যমে করা হবে।
আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপে সম্পদের মূল্যায়ন করা হবে, যাতে নির্ধারণ করা যায় সংস্থাগুলোর সম্পদ ঋণকে ছাড়িয়ে আছে কিনা। যদি সম্পদ ঋণকে অতিক্রম করে, তবে শেয়ারহোল্ডারদের কিছু অংশ ফেরত দেওয়া সম্ভব হতে পারে; অন্যথায় শেয়ারহোল্ডারদের কোনো ক্ষতিপূরণ না-ও হতে পারে।
প্রক্রিয়ার দ্রুততা নিশ্চিত করার জন্য, মানসুর উল্লেখ করেন যে রমজান মাসের আগে সব প্রয়োজনীয় আইনি ও আর্থিক কাজ সম্পন্ন করা হবে। এতে জমাকারীরা রমজানের প্রথম দিনেই তাদের মূলধন পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সময়ে, বর্তমানে মিশ্রণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ব্যাংকের উপর অতিরিক্ত ফরেনসিক অডিট চালু করা হবে। এই অডিটের লক্ষ্য হল পূর্ববর্তী শাসনকালে ঘটিত জালিয়াতি ও অনিয়মের দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা।
অডিটে দোষী প্রমাণিত কর্মকর্তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই পদক্ষেপটি আর্থিক সেক্টরে স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এনবিএফআই দেউলিয়া প্রক্রিয়া এবং জমাকারীদের দ্রুত ফেরত পাওয়া আর্থিক সেক্টরের বিশ্বাস পুনরুদ্ধারে সহায়ক হবে। বিশেষ করে রমজান মাসে নগদ প্রবাহের প্রয়োজন বাড়ার সময়, এই পদক্ষেপটি ভোক্তাদের আস্থা জোরদার করবে।
দীর্ঘমেয়াদে, ব্যাংক রেজোলিউশন অর্ডিন্যান্সের কার্যকর বাস্তবায়ন এবং মিশ্রণ ব্যাংকের অডিটের ফলাফল দেশের আর্থিক কাঠামোর শক্তিশালীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তদুপরি, দেউলিয়া সংস্থার সম্পদ বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত তহবিলের সুষ্ঠু বণ্টন আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
সারসংক্ষেপে, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত উদ্যোগে, রমজান আগে ব্যক্তিগত জমাকারীদের মূলধন ফেরত পাওয়া সম্ভব হবে, এবং মিশ্রণ ব্যাংকের অডিটের মাধ্যমে আর্থিক দুর্নীতির দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই পদক্ষেপগুলো দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের পুনর্গঠন ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হ্রাসে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।



