আইসল্যান্ডের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গায়িকা বিয়র্ক ৫ জানুয়ারি সোমবার ইনস্টাগ্রামে গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেন। তিনি পোস্টে গ্রিনল্যান্ডের জনগণকে আশীর্বাদ জানিয়ে, আইসল্যান্ডের ১৯৪৪ সালে ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা অর্জনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিয়র্কের বার্তায় তিনি বলেন, “আমি গ্রিনল্যান্ডের মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি অনুভব করছি”।
এই প্রকাশের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রভাব রয়েছে। ৪ জানুয়ারি, ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ান থেকে সাংবাদিকদের সামনে গ্রিনল্যান্ডকে কৌশলগত নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে চাওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি যুক্তি দেন, “গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান রাশিয়া ও চীনের নৌবহরের কাছাকাছি, তাই এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য”। একই সপ্তাহে, ট্রাম্প আটলান্টিকের সঙ্গে কথোপকথনে গ্রিনল্যান্ডের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় উল্লেখ করেন।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, যার নিজস্ব সরকার এবং পার্লামেন্ট রয়েছে, তবে পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ক সিদ্ধান্ত ডেনমার্কের হাতে থাকে। ট্রাম্পের এই ধরনের মন্তব্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ইচ্ছা পূর্বে বহুবার বিরোধের কারণ হয়েছে।
একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আক্রমণ চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে। এই অভিযানটি শীঘ্রই আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় শিরোনাম হয়ে ওঠে এবং ট্রাম্পের বিদেশি নীতি নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করে। মাদুরোর গ্রেপ্তার পর ট্রাম্প উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলাকে “অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালনা করবে” এবং কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করেননি।
ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড ও কানাডা সংযুক্তিকরণ পরিকল্পনা তার “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে বিশ্লেষকরা মন্তব্য করছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষক অ্যানা লারসেন বলেন, “ট্রাম্পের এই ধরনের রেটোরিক কেবলমাত্র কৌশলগত স্বার্থের ভিত্তিতে নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে ভিত্তি করে গড়ে উঠছে”। তিনি যোগ করেন, “এ ধরনের ঘোষণার ফলে ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়বে এবং নর্ডিক অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে প্রভাব ফেলতে পারে”।
ডেনমার্কের সরকার ট্রাম্পের মন্তব্যকে “অবৈধ এবং অপ্রাসঙ্গিক” বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জোয়াকিম হ্যানসেনের অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন ও আন্তর্জাতিক আইনের অধিকারকে সম্মান করা হবে এবং কোনো একতরফা দাবি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিরোধী।
বিয়র্কের সমর্থনমূলক বার্তা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা সমর্থকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পায়। ইনস্টাগ্রাম পোস্টে তার মন্তব্যের পরে বহু ব্যবহারকারী গ্রিনল্যান্ডের সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ডের ঐতিহাসিক ভিকিং সম্পর্কের স্মরণ করিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে সাম্প্রতিক নৌবহর আক্রমণ এবং মাদুরোর গ্রেপ্তারকে যুক্ত করে ট্রাম্পের নিরাপত্তা নীতি পুনরায় আলোচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষক রিকার্ডো মোরালেস উল্লেখ করেন, “ট্রাম্পের এই ধারাবাহিকতা তার প্রশাসনের বিদেশি হস্তক্ষেপের প্যাটার্নকে প্রতিফলিত করে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্দেহ বাড়াচ্ছে”। তিনি আরও বলেন, “গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা দুটোই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য জটিল চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে”।
এই ঘটনাগুলোর পরবর্তী মাইলস্টোন হিসেবে, ডেনমার্কের পার্লামেন্টে গ্রিনল্যান্ডের স্বায়ত্তশাসন সংক্রান্ত আলোচনার সময়সূচি নির্ধারিত হয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তা নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও মানবাধিকার গোষ্ঠীও স্পষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের আহ্বান জানাচ্ছে।
সারসংক্ষেপে, বিয়র্কের সমর্থনমূলক বার্তা এবং ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংযুক্তিকরণ দাবি একসাথে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিবেশে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সংলাপের গতি, পাশাপাশি গ্রিনল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা, এই সময়ের মূল বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।



