তুরস্কের রাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোনে অনুরোধ করেন ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও অস্থির না করতে। এই কথোপকথনটি তার ক্যাবিনেট মিটিং শেষে প্রকাশিত বক্তব্যের মাধ্যমে জানানো হয়। এর্দোয়ান জোর দিয়ে বলেন, তুরস্ক ভেনেজুয়েলার জনগণের পাশে থাকবে এবং কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ দেশের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এরদোয়ান উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার জনগণ অতীতে তুরস্কের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তিনি সতর্ক করেন, যদি কোনো দেশ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন করে বা অন্যের সার্বভৌমত্বকে হুমকি দেয়, তবে তা বৈশ্বিক স্তরে গুরুতর সমস্যার দিকে নিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক নিয়মের ভিত্তিতে ব্যবস্থা রক্ষা করা তুরস্কের জন্য অগ্রাধিকার।
একই সময়ে, ভেনেজুয়েলার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতে উপস্থিত হন। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো, যাকে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে এবং এখনও নিজেকে দেশের প্রেসিডেন্ট বলে দাবি করেন। তিনি আদালতে বলেন, তিনি কোনো অপরাধ করেননি এবং নিজেকে একজন ভদ্র মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
মাদুরোর বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে: মাদক ব্যবসার মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ (নারকো-টেররিজম), কোকেন আমদানির ষড়যন্ত্র, অবৈধভাবে মেশিনগান এবং ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের মালিকানা। এই অভিযোগগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কর্তৃপক্ষের দ্বারা উপস্থাপিত। আদালতে তার বক্তব্যের মাঝেই বিচারক অ্যালভিন হেলারস্টাইন তাকে থামিয়ে দেন।
মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসও একই মামলায় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। আদালতে উভয়ের জন্য পরবর্তী শুনানি ১৭ মার্চ নির্ধারিত হয়েছে। এই তারিখের আগে কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হবে না, তবে মামলার অগ্রগতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
মাদুরোকে ব্রুকলিনের কারাগার থেকে হেলিকপ্টারে নিয়ে গিয়ে ম্যানহাটনের আদালতে আনা হয়। তাকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার অধীনে পরিবহন করা হয় এবং তিনি কারাবন্দিদের পরিচিত কমলা-বাদামি পোশাক পরিধান করে উপস্থিত হন। এই দৃশ্যটি মিডিয়ার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
এরদোয়ানের মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে, তুর্কি সরকার ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সংলাপের আহ্বান জানায়। তিনি জোর দেন, কোনো বহিরাগত শক্তি যদি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপ করে, তবে তা অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। তুরস্কের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
মাদুরোর আদালতে উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে নতুন আলোচনার সূচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানের ফলে মাদুরোর গ্রেপ্তার এবং তার পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ বাড়িয়ে তুলেছে। তুরস্কের এর্দোয়ান এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে, যাতে ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিবেশ আরও অস্থির না হয়।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এর্দোয়ানের এই আহ্বান তুরস্কের আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার প্রভাব বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে। একই সঙ্গে, ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হবে মাদুরোর আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তুরস্কের এই সতর্কতা উভয়ই ল্যাটিন আমেরিকায় শক্তির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পরিবর্তিত হয়, তবে তুরস্কের অবস্থানও পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে অঞ্চলের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
মাদুরোর মামলায় বিচারক যে রায় দেবেন, তা ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে পারে। যদি মাদুরো দোষী প্রমাণিত হন, তবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলা নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হতে পারে।
এখন পর্যন্ত তুরস্কের সরকার ভেনেজুয়েলার জনগণের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানায়। এর্দোয়ান উল্লেখ করেন, কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করলে তা কেবল এক দেশ নয়, পুরো বিশ্বব্যবস্থার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন মাদুরোর আইনি লড়াই এবং আন্তর্জাতিক শক্তির পারস্পরিক ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল। তুরস্কের এই সতর্কতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ উভয়ই ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।



