খাগড়াছড়ি সদর কমলছড়িমুখ এলাকায় কৃষক সোনামনি চাকমা পরিচালিত আখ গুড় উৎপাদন কারখানার কার্যক্রমে রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী সোমবার সরেজমিনে উপস্থিত হন। পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের উদ্যোগের মূল্য সংযোজন প্রক্রিয়া যাচাই করা এবং স্থানীয় বাজারে গুড়ের সম্ভাব্য চাহিদা ও উৎপাদন ক্ষমতা মূল্যায়ন করা।
সোনামনি চাকমা ২০২২ সাল থেকে প্রায় চার একর জমিতে আখ চাষে লিপ্ত এবং এই বছর তিনি আখ থেকে গুড় উৎপাদনের কাজ শুরু করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন চালু করেন। আখের ফলের উচ্চ চিনি মাত্রা গুড় তৈরির জন্য উপযোগী, ফলে কৃষকরা ফসলের অতিরিক্ত অংশকে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তর করতে পারছেন। তার উদ্যোগটি আখ চাষের পাশাপাশি গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ানোর একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিদর্শনে রাঙ্গামাটির উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী, খাগড়াছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুক্তা চাকমা, কৃষি কর্মকর্তা রাব্বি হাসান এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মংডু মারমা উপস্থিত ছিলেন। সবাই একসঙ্গে গুড় উৎপাদনের প্রক্রিয়া, কাঁচামাল সংরক্ষণ এবং গুণগত মান নিশ্চিত করার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা গুড় তৈরির জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম, গরম করার পাত্র এবং গুড়ের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন। তারা লক্ষ্য করেন যে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার সীমিত হলেও, কৃষক নিজে হাতে গুড়ের গুণমান বজায় রাখতে সচেষ্ট। কর্মকর্তারা গুড়ের প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণে উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, স্থানীয় বাজারে সরাসরি বিক্রয় ও গ্রাহক সংযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন।
অধিকন্তু, গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে, কারণ আখের ফলের বিক্রয়মূল্য তুলনামূলকভাবে কম এবং গুড়ের চাহিদা স্থানীয় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে স্থিতিশীল। গুড়ের মূল্য সংযোজনের ফলে কৃষক অতিরিক্ত আয় অর্জন করতে পারেন, যা কৃষি উৎপাদন ও গ্রামীণ অর্থনীতির সমন্বিত উন্নয়নে সহায়তা করবে।
অফিসাররা উল্লেখ করেন যে, আখ গুড়ের উৎপাদন চেইনকে শক্তিশালী করতে প্রশিক্ষণ, ক্রেডিট সুবিধা এবং বাজার সংযোগের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। গুড়ের গুণমান নিশ্চিত করতে মান নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড অনুসরণ করা এবং প্যাকেজিংয়ে আধুনিক ডিজাইন গ্রহণ করা হলে গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, গুড়ের উৎপাদন মৌসুমী আখ ফসলের অতিরিক্ত অংশ ব্যবহার করে বর্জ্য হ্রাসের একটি কার্যকর পদ্ধতি, যা পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ থেকেও ইতিবাচক।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গুড়ের চাহিদা মৌসুমী খাবার, মিষ্টি এবং ঐতিহ্যবাহী রেসিপিতে ব্যাপক। স্থানীয় সুপারমার্কেট, গ্রামীণ বাজার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গুড়ের বিক্রয় সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, বৃহত্তর বাজারে প্রবেশের জন্য গুড়ের শেলফ লাইফ বাড়ানো, সঠিক লেবেলিং এবং মান নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন।
অধিকন্তু, গুড় উৎপাদন কৃষকের জন্য অতিরিক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা, প্যাকেজিং ও বিতরণে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। এই দিকটি স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত, বিশেষ করে তরুণ কর্মসংস্থান সমস্যার সমাধানে সহায়ক।
অফিসাররা শেষ পর্যায়ে কৃষককে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেন, যার মধ্যে গুড়ের ব্র্যান্ডিং, মূল্য নির্ধারণ কৌশল এবং সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত। তারা উল্লেখ করেন যে, সরকারী সহায়তা, মাইক্রোফাইন্যান্স এবং কৃষি বীমা পরিকল্পনা গুড় উৎপাদনকে আর্থিকভাবে স্থিতিশীল করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, রাঙ্গামাটির অতিরিক্ত পরিচালক ও অন্যান্য কৃষি কর্মকর্তার এই পরিদর্শন কৃষকের আখ গুড় উদ্যোগকে সমর্থন ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। গুড়ের মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি পরিবেশগত বর্জ্য হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে গুড়ের মান ও বাজারজাতকরণে ধারাবাহিক উন্নতি হলে, আখ গুড় শিল্পটি গ্রামীণ অর্থনীতির একটি টেকসই সেক্টর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।



