হেলিওফিজিক্সের গবেষকরা সূর্যের বাইরের বায়ুমণ্ডলের সীমা, যাকে আলফেন ক্রিটিক্যাল সারফেস বলা হয়, তার প্রথম স্বতন্ত্র মানচিত্র প্রকাশ করেছেন। এই মানচিত্রটি সূর্যের ক্রিয়াশীলতা কীভাবে গ্রহাণু, স্যাটেলাইট এবং পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রভাব ফেলে তা পূর্বাভাসে সহায়তা করবে।
আলফেন সারফেস হল এমন একটি সীমা যেখানে সূর্য থেকে বের হওয়া প্লাজমা ও কণাগুলি আর সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকে না এবং স্বাধীনভাবে সৌরবায়ু হিসেবে বিস্তৃত হয়। বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন, এই সীমা সূর্যের কোরোনা ও সৌরবায়ুর মধ্যে প্রায় ১.৫ থেকে ২ গুণ সূর্যের ব্যাস পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
পূর্বে এই সীমার আকার ও গঠন অনুমান করা হতো পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে থাকা মহাকাশযানের তথ্যের ভিত্তিতে। তবে ২০২১ সালে নাসার পার্কার সোলার প্রোব প্রথমবার সূর্যের আলফেন সারফেসের নিচে প্রবেশ করে, যখন তা সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৩ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে ছিল। এরপর থেকে প্রোব অতিরিক্ত পনেরোবার কোরোনার মধ্যে ঢুকে, ডিসেম্বর ২০২৪-এ সর্বনিম্ন ৬.১ মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে পৌঁছেছে।
এই সরাসরি পরিমাপের সঙ্গে অন্যান্য সূর্য পর্যবেক্ষণকারী মহাকাশযানের রিমোট ডেটা যুক্ত করে গবেষক দল আলফেন সারফেসের সুনির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করেছে। মানচিত্রে সীমার আকৃতি, প্লাজমার ঘনত্ব, গতি এবং তাপমাত্রা বিস্তারিতভাবে চিত্রিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের কার্যকলাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আলফেন সারফেসের আকারও বৃদ্ধি পায় এবং তার পৃষ্ঠে ধারালো, শিংযুক্ত গঠন দেখা যায়। সূর্যের ন্যূনতম পর্যায়ে, যখন সূর্যকুয়াশা ও ফ্লেয়ার কম থাকে, তখন এই সীমা তুলনামূলকভাবে ছোট এবং মসৃণ থাকে। তবে সূর্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যেখানে সূর্যকুয়াশা ও ফ্লেয়ার বেশি হয়, তখন সীমা বিস্তৃত হয়ে আরও শিংযুক্ত ও অগোছালো রূপ নেয়।
এই পরিবর্তনগুলো সূর্যবায়ুর তীব্রতা ও দিকনির্দেশে সরাসরি প্রভাব ফেলে, যা স্যাটেলাইটের যোগাযোগ, বৈদ্যুতিক গ্রিডের স্থিতিশীলতা এবং মহাকাশযানের নিরাপত্তা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া, সৌরবায়ুর তীব্রতা মানব ও প্রাণীর স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে উচ্চ অক্ষাংশে অরোরা দেখার সময়।
মানচিত্রের তথ্য ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে সৌরঝড়ের পূর্বাভাসের নির্ভুলতা বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। আলফেন সারফেসের অবস্থান ও গঠন পরিবর্তনের রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ করলে সৌরবায়ুর তীব্রতা ও গতি পূর্বাভাসে সহায়তা করবে, ফলে স্যাটেলাইট ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো সময়মতো সুরক্ষা ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এই গবেষণার ফলাফল ২০ ডিসেম্বর প্রকাশিত অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্সে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সূর্যের ১১ বছরের চৌম্বক চক্রের অর্ধেক সময়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে আলফেন সারফেসের পরিবর্তন ধরা পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, সূর্যের কার্যকলাপের দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ এবং আলফেন সারফেসের সঠিক মানচিত্র ভবিষ্যতে মহাকাশে মানব মিশন পরিচালনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সৌরবায়ু গবেষণার এই নতুন অগ্রগতি বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি সংস্থাগুলোকে আরও সুনির্দিষ্ট মডেল তৈরি করতে সহায়তা করবে, যা গ্রহীয় পরিবেশের পরিবর্তন ও বায়ুমণ্ডলীয় ঘটনার পূর্বাভাসে ব্যবহার করা যাবে।
সারসংক্ষেপে, পার্কার সোলার প্রোবের সরাসরি মাপ এবং অন্যান্য মহাকাশযানের ডেটা সমন্বয় করে তৈরি করা আলফেন সারফেসের মানচিত্র সূর্যের কার্যকলাপের প্রভাবকে আরও স্পষ্টভাবে বুঝতে সাহায্য করবে এবং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য সৌরঝড়ের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করবে।
আপনি কি মনে করেন, এই নতুন মানচিত্রের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে সৌরঝড়ের পূর্বাভাসে কী ধরনের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সম্ভব হবে?



