দূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতিতে প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামা সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা হবে বলে জানিয়েছেন। তিনি এই মন্তব্য সোমবার (৫ জানুয়ারি) রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের (RAC) নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় প্রকাশ করেন।
সেই সভায় দুদক ও RAC উভয়ের প্রতিনিধিরা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে তা নিয়ে আলোচনা করেন। মোমেন উল্লেখ করেন, হলফনামায় উল্লিখিত সম্পদের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের পার্থক্য চিহ্নিত হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দুদক, যা ২০১১ সালে গৃহীত দুর্নীতি বিরোধী আইন অনুসারে গঠিত, তার প্রধান দায়িত্ব হল সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরে দুর্নীতি রোধ ও দমন করা। নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে দুদকের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রার্থীর সম্পদ প্রকাশের মাধ্যমে স্বার্থের সংঘাত ও অনিয়মের সম্ভাবনা কমে।
চেয়ারম্যান মোমেন স্পষ্ট করে বলেন, যদি কোনো প্রার্থীর সম্পদে অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তবে দুদক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এতে সম্পদ ঘোষণার ভুল তথ্য, সম্পদের অতিরিক্ত বা কম উল্লেখ, অথবা সম্পদ লুকিয়ে রাখার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এছাড়া, নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করা হয়েছে যে, কোনো প্রার্থীর সম্পদে অমিল দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে দুদককে জানাতে হবে। এই নির্দেশনা নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে প্রার্থীর তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নেওয়া হয়েছে।
দুদক সম্প্রতি একটি নতুন গেজেট প্রকাশ করেছে, যার মাধ্যমে দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দেওয়া হবে না বলে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে মোমেন স্বীকার করেন, যদি কোনো পক্ষ থেকে গেজেটের প্রয়োগে অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দেয়, তবে তা নিয়ে সরকারী স্তরে আলোচনা করা হবে।
দুদকের এই উদ্বেগের প্রতিক্রিয়ায়, মোমেন উল্লেখ করেন যে, সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে গেজেটের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা হবে এবং কোনো অননুমোদিত ছাড়ের সম্ভাবনা দূর করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ছাড়া নির্বাচনী প্রক্রিয়া সঠিকভাবে চলবে না।
RAC-এর নতুন কমিটি, যা সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে, দুদকের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে যে, হলফনামা যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। তারা দাবি করে, ভবিষ্যতে আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত যাতে প্রার্থীরা সম্পদের সত্যিকারের তথ্য প্রদান করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, এই পদক্ষেপের ফলে প্রার্থীদের মধ্যে স্বচ্ছতার চাহিদা বাড়বে এবং যারা সম্পদ গোপন করে আসছেন তাদের জন্য কঠোর শাস্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে। ফলে নির্বাচনী লড়াইয়ে আর্থিক স্বচ্ছতা একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে পূর্বে বহুবার সম্পদ ঘোষণার অসঙ্গতি নিয়ে বিতর্ক দেখা গেছে; তবে দুদকের সক্রিয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত এই বিষয়টি যথাযথভাবে সমাধান হয়নি। মোমেনের এই ঘোষণার মাধ্যমে দুদক ঐতিহাসিকভাবে প্রথমবারের মতো প্রার্থীর সম্পদ যাচাইকে কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু করে তুলেছে।
দুদক ও নির্বাচন কমিশন আগামী সপ্তাহে একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে, যাতে হলফনামা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া দ্রুত ও কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়। প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি, ফলাফল প্রকাশের জন্য স্বচ্ছ পদ্ধতি গৃহীত হবে।
শেষে, মোমেন উল্লেখ করেন, দুদকের লক্ষ্য শুধুমাত্র দুর্নীতি দমন নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করা। তিনি আশাবাদী যে, প্রার্থীর সম্পদ যাচাইয়ের মাধ্যমে ভোটারদের আস্থা পুনর্গঠন হবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও ন্যায়সঙ্গত হবে।



