এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশকে সরাসরি সরকারী ঋণ, অনুদান ও গ্যারান্টি সহ মোট ২.৫৭ বিলিয়ন ডলার নতুন আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই পদক্ষেপটি দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। এডিবি এই অর্থ সরাসরি রাষ্ট্র বা সরকারী সংস্থাকে দেবে, যার পরিশোধের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর থাকবে।
সোভারেইন ফাইন্যান্সিং বলতে এডিবি কর্তৃক সরাসরি জাতীয় সরকারকে প্রদত্ত ঋণ, অনুদান বা গ্যারান্টি বোঝায়, যেখানে পরিশোধের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। এই পদ্ধতি পূর্বে ২০২৪ সালে ১.১৮ বিলিয়ন ডলারের সমান পরিমাণে করা হয়েছিল, যা এখন দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০২৫ সালের আর্থিক পরিকল্পনা শক্তি, পরিবহন, ব্যাংকিং সংস্কার, নগর সেবা, জলবায়ু সহনশীলতা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং কোসবাজারে জীবিকা সমর্থনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেয়। এডিবি প্রকাশিত বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে যে, এই বিনিয়োগগুলো অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে বেশি মনোযোগ দেবে।
প্রকল্পগুলোকে সেক্টর অনুযায়ী সমানভাবে ভাগ করা হয়েছে, যাতে অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক সংস্কার উভয়ই সমন্বিতভাবে অগ্রসর হয়। এডিবি দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, সেবা সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখবে।
এডিবি দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সময়কালে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারগুলোকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এডিবি দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে অবকাঠামো, সেবা ও মানব উন্নয়নের লক্ষ্যগুলোকে ত্বরান্বিত করবে।
মোট ১০টি প্রকল্পে ২.৫৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে প্রায় ৩৫ শতাংশ পরিবহন অবকাঠামোতে, ২৩ শতাংশ আর্থিক খাতে এবং ১৬ শতাংশ পাবলিক সেক্টর ব্যবস্থাপনা ও শাসনে বরাদ্দ করা হয়েছে। অবশিষ্ট অংশে শক্তি, জল ও নগর উন্নয়ন এবং মানবিক ও সামাজিক উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত।
পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে, যা দেশের রেল, সড়ক ও বন্দর সংযোগ উন্নত করার জন্য ব্যবহার হবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম-দোহাজারি রেললাইন প্রকল্পে ৬৮৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে, যা গুরুত্বপূর্ণ রেল করিডোরকে আধুনিকায়ন এবং সরাসরি ট্রেন সেবা চালু করার লক্ষ্য রাখে।
আর্থিক সেক্টরে ২৩ শতাংশ বরাদ্দের মাধ্যমে ব্যাংকিং সংস্কার, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ঋণ প্রবেশযোগ্যতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য ক্রেডিট সহজলভ্য করে অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে।
পাবলিক সেক্টর ব্যবস্থাপনা ও শাসনে ১৬ শতাংশ বরাদ্দের মাধ্যমে সরকারি সংস্থার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, নীতি বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত এবং দুর্নীতি হ্রাসের লক্ষ্য রয়েছে। এই সংস্কারগুলো দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করবে।
শক্তি খাতে ১১ শতাংশ বরাদ্দের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রিড আধুনিকায়ন এবং শক্তি দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ চালু হবে। জল ও নগর উন্নয়নে ৯ শতাংশ বরাদ্দের মাধ্যমে শহরের মৌলিক সেবা, পানি সরবরাহ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা হবে।
মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নে ৬ শতাংশ বাজেটের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হবে, যা বিশেষ করে কোসবাজারের শরণার্থী ও স্থানীয় জনগণের জীবনের মান উন্নত করবে।
চট্টগ্রাম-দোহাজারি রেললাইন প্রকল্পটি দক্ষিণ এশিয়ার সাবরিজিয়নাল অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাবসেক) উদ্যোগের অংশ, যা রেলপথের গতি ও নিরাপত্তা বাড়িয়ে বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ করবে। সরাসরি ট্রেন সেবা চালু হলে অঞ্চলীয় সংযোগ ও বাণিজ্যিক সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
এই বৃহৎ আর্থিক প্যাকেজ দেশের অবকাঠামো ঘাটতি কমিয়ে বিনিয়োগের আকর্ষণ বাড়াবে, পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে। বিশেষ করে রেল, সড়ক ও শক্তি প্রকল্পগুলো নির্মাণ পর্যায়ে স্থানীয় শ্রমশক্তির চাহিদা পূরণ করবে।
দীর্ঘমেয়াদে এডিবি-সহায়িত প্রকল্পগুলো দেশের জিডিপি বৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে, তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সময়সূচি মেনে চলা, পরিবেশগত প্রভাব নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়ে যাবে। এই ঝুঁকিগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করলে বিনিয়োগের রিটার্ন সর্বোচ্চ করা সম্ভব হবে।



