বাংলাদেশের সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে সমগ্র মুদ্রাস্ফীতি হার ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা নভেম্বরের ৮.২৯ শতাংশের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশ করেছে এবং দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র তুলে ধরেছে।
খাবার দামের সূচকও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে; ডিসেম্বর মাসে খাবার মুদ্রাস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশে রেকর্ড হয়েছে, যেখানে নভেম্বরের হার ছিল ৭.৩৬ শতাংশ। চাল, তেল, শাকসবজি ও দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্যে ধারাবাহিক বৃদ্ধি গৃহস্থালীর ব্যয়ভারকে তীব্রতর করেছে।
অখাদ্য পণ্যের দামের সূচকও সামান্য বাড়ে, ডিসেম্বরের অখাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে রেকর্ড হয়েছে, যা নভেম্বরের ৯.০৮ শতাংশের তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালী যন্ত্রপাতি ও পোশাকের মূল্যে এই বৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট।
দুইটি সূচকের সমন্বয়ে গড় মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি গৃহস্থালীর ক্রয়ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য মৌলিক পণ্যের দাম বাড়া মানে দৈনন্দিন ব্যয়ের অংশে বড় চাপ। ফলে ভোক্তারা প্রয়োজনীয় পণ্যের পরিমাণ কমিয়ে বা সস্তা বিকল্পের দিকে ঝুঁকতে পারে।
খুচরা বাজারে এই প্রবণতা ইতিমধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে; সুপারমার্কেট ও স্থানীয় বাজারে মূল্যের ধারাবাহিক বাড়তি চাহিদা দেখা যাচ্ছে। বিক্রেতারা মুনাফা রক্ষার জন্য মূল্য সমন্বয় করছে, যা আবার ভোক্তাদের ব্যয় বাড়াচ্ছে। ফলস্বরূপ, বিক্রয় পরিমাণে সাময়িক হ্রাসের সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে অ-প্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে।
উৎপাদন খাতেও কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। টেক্সটাইল, সিমেন্ট ও রসায়ন শিল্পের মতো মূলধনী শিল্পগুলোতে ইনপুট খরচের বৃদ্ধি সরাসরি পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে প্রভাব ফেলবে। এ কারণে রপ্তানি মূল্যের প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, বিশেষত যখন আন্তর্জাতিক বাজারে একই পণ্যের দাম স্থিতিশীল থাকে।
মুদ্রা নীতি নির্ধারকদের জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে। বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রাস্ফীতি লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুদের হার সমন্বয় বা রিজার্ভ রেশিও বাড়ানোর কথা বিবেচনা করতে পারে। তবে অতিরিক্ত কঠোর নীতি গৃহস্থালীর ঋণগ্রহীতাদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তাই নীতি সমন্বয় সতর্কতার সাথে করা প্রয়োজন।
আগামী মাসগুলোতে মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা নির্ধারণে কয়েকটি বহিরাগত উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈশ্বিক খাদ্যদ্রব্যের দাম, তেল ও গ্যাসের মূল্যের ওঠানামা, এবং টাকার মানের পরিবর্তন সরাসরি দেশীয় দামের ওপর প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে তেল দামের বৃদ্ধি জ্বালানি খরচ বাড়িয়ে অখাদ্য পণ্যের দামকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই পরিস্থিতিতে খরচ নিয়ন্ত্রণের জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল অপ্টিমাইজ করতে হবে এবং বিকল্প কাঁচামাল অনুসন্ধান করতে হবে। একই সঙ্গে, ভোক্তাদের জন্য বাজেট পরিকল্পনা ও সাশ্রয়ী বিকল্পের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সরকারী নীতি সমর্থন ও সামাজিক নিরাপত্তা জালকে শক্তিশালী করে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর উপর চাপ কমানো সম্ভব।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বর মাসে মুদ্রাস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা খাবার ও অখাদ্য উভয় দিকেই দামের ঊর্ধ্বগতি নির্দেশ করে। এই প্রবণতা গৃহস্থালীর ব্যয়ভার বাড়িয়ে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যকে প্রভাবিত করবে। নীতি নির্ধারক, ব্যবসা ও ভোক্তা সকলেরই এই বাস্তবতা মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।



