ঢাকার আগারগাঁয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজন করা নির্বাচনী কর্মশালায় প্রধান উপদেষ্টা বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) গণভোটের মৌলিক নীতি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, গণভোট প্রতি পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত হবে না এবং এতে কোনো প্রার্থী তালিকাভুক্ত থাকবে না; ভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি দেশের শাসন পদ্ধতি নির্ধারণ করবে।
ড. রীয়াজের মতে, গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হল নাগরিকদেরকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ প্রদান করা, যাতে ভবিষ্যৎ নীতি ও শাসন কাঠামো সম্পর্কে তাদের ইচ্ছা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই প্রক্রিয়ায় ভোটের ফলাফল দেশের সংবিধানে যুক্ত হবে এবং জুলাই সনদকে সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ফলে, জনগণ সরাসরি দেশের শাসন পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষমতা পাবে।
কর্মশালায় ধর্ম উপদেষ্টা এ.এফ.এম. খালিদ হোসেনও উপস্থিত ছিলেন এবং তিনি গণভোটের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর প্রথমবারের মতো সরকারী দল ও বিরোধী দল একসাথে কাজ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশন গঠন করতে পারবে। এ ধরনের কাঠামো কেবল গণভোটের মাধ্যমে সম্ভব, তিনি যুক্তি দেন।
খালিদ হোসেন আরও উল্লেখ করেন, ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এবং রাজনৈতিক ছলচাতুরি বন্ধ করতে গণভোটের দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত নেবে, ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও দুর্নীতির ঝুঁকি কমে যাবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি গণভোটকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন।
ড. রীয়াজের বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রশ্নের উত্তর দেন যে, যদি কেউ গণভোটের ধারণা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তিনি সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করেন যে, এটি এমন একটি নির্বাচন যেখানে জনগণ দেশের শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে সরাসরি মতামত প্রকাশ করে। তিনি জোর দেন, ভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত ফলাফলই দেশের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণ করবে।
এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য ছিল গণভোটের ধারণা জনসাধারণের কাছে সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা গণভোটের ধারণা ও এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর সেশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
গণভোটের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভোটের ফলাফল সংবিধানে সংযোজনের পর তা আইনগত বাধ্যবাধকতা হয়ে ওঠে। ফলে, দেশের শাসন পদ্ধতি পরিবর্তনের জন্য কোনো পার্লামেন্টারী ভোটের প্রয়োজন না থেকে সরাসরি জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। এই প্রক্রিয়া দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি নাগরিকদের অংশগ্রহণ বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সরকারি কর্ম কমিশনের গঠনও গণভোটের ফলাফলের ওপর নির্ভরশীল হবে। এই সংস্থাগুলি দেশের শাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করতে কাজ করবে, এবং তাদের গঠন প্রক্রিয়ায় গণভোটের ফলাফলই একমাত্র মানদণ্ড হবে।
গণভোটের সমর্থকরা দাবি করেন, এই পদ্ধতি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনসাধারণের আস্থা বাড়াবে। তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রার্থীর অভাব ও নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে কীভাবে ভোটারদের জন্য স্পষ্ট বিকল্প তৈরি হবে। এই বিষয়গুলো নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।
অধিকন্তু, গণভোটের বাস্তবায়ন কিভাবে দেশের আইনি কাঠামোকে প্রভাবিত করবে, তা নির্ধারণের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের কাজ দ্রুততর হতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় সরকার, বিরোধী দল ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত ভূমিকা প্রত্যাশিত।
ড. রীয়াজ ও খালিদ হোসেনের বক্তব্যের ভিত্তিতে, আগামী মাসগুলোতে গণভোটের কাঠামো ও সময়সূচি চূড়ান্ত করার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হতে পারে। এই কমিটি ভোটের পদ্ধতি, ভোটার তালিকা ও ফলাফল যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নির্ধারণে দায়িত্বশীল হবে।
সারসংক্ষেপে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন দ্বারা আয়োজিত কর্মশালায় গণভোটের মৌলিক নীতি, সময়সীমা ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। প্রধান উপদেষ্টা ড. আলী রীয়াজ ও ধর্ম উপদেষ্টা এ.এফ.এম. খালিদ হোসেন উভয়ই গণভোটকে দেশের শাসন পদ্ধতি পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন, এবং এর দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে সুর তুলেছেন। ভবিষ্যতে এই ধারণা কীভাবে রূপ নেবে, তা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনমতের ওপর নির্ভরশীল থাকবে।



