বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত সোমবার ডিসেম্বর ২০২৫ মাসের ভোক্তা মূল্যস্ফীতি প্রকাশ করেছে। মোট সূচক ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্ব মাসের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক সূচকে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা নির্দেশ করে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, দুই মাস ধারাবাহিকভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরের অধিক সময়ে সূচক ৮ শতাংশের আশেপাশে দোলাচল করেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
খাদ্যদ্রব্যের দামের পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.৭১ শতাংশে রেকর্ড হয়েছে, যেখানে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯.১৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পার্থক্য বাজারে বিভিন্ন সেক্টরের চাপকে প্রতিফলিত করে।
খাদ্যদ্রব্যের দামের ধারাবাহিক বৃদ্ধি তিন মাসের পরপর ঘটেছে, যা ভোক্তাদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি উচ্চ স্তরে স্থায়ী রয়েছে। ২০২৫ সালের গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৭৭ শতাংশ হিসেবে রেকর্ড হয়েছে।
বেতন বৃদ্ধির হার এই পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর মাসে জাতীয় বেতন বৃদ্ধির হার ৮.০৮ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, যা মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে বাস্তব আয় হ্রাস পেয়েছে এবং গৃহস্থালির ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়লে পরিবারের ব্যয় কাঠামোতে পরিবর্তন আনা বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ভোক্তা এক বছর আগে ১০০ টাকা দিয়ে পণ্য ও সেবা কিনে থাকেন, তবে একই পণ্য ও সেবা এখন ১০৮.৪৯ টাকা খরচ হবে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় অতিরিক্ত ৮.৪৯ টাকা ব্যয় যোগ হয়েছে।
একটি গড় পরিবারের মাসিক ব্যয় যদি এক বছর আগে এক লাখ টাকা হয়, তবে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত তা প্রায় ১,০৮,৪৯০ টাকায় বৃদ্ধি পাবে। এই সংখ্যা গড় হিসাবের উপর ভিত্তি করে, তবে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীর জন্য প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।
কম আয়ের পরিবারগুলো মূলত খাদ্য, পোশাক ও যাতায়াতের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণে বেশি চাপের মুখে পড়ে। বেতন বৃদ্ধির হার যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে, তবে বাস্তব আয় হ্রাস পায় এবং সঞ্চয় ক্ষমতা হ্রাস পায়।
বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার ফলে ব্যবসায়িক খরচও বাড়ছে। উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যয় বৃদ্ধি পেলে, কোম্পানিগুলো মূল্য নির্ধারণে সমন্বয় করতে বাধ্য হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর ফিরে আসে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, যদি মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের আশেপাশে স্থায়ী থাকে, তবে বাস্তব মজুরি হ্রাসের প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এই পরিস্থিতি ভোক্তা ব্যয়ের হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বর ২০২৫ মাসের মূল্যস্ফীতি ৮.৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে, যা পূর্ব মাসের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেতন বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। এই পার্থক্য গৃহস্থালির ব্যয় কাঠামোতে চাপ সৃষ্টি করছে এবং ব্যবসায়িক খরচ বাড়াচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের জন্য বাস্তব আয় রক্ষা ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে।



