ইরানে গত রবিবার থেকে শুরু হওয়া ব্যাপক প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অন্তত ষোলো জনের মৃত্যু হয়েছে এবং পাঁচশত আশি দুই জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, যা দেশের বিভিন্ন শহরে নাগরিকদের অসন্তোষের মূল কারণ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে ডলার-রিয়াল রেটের রেকর্ড পতনের পর দোকানদারদের ধর্মঘটের সূচনা, পরে পুরো দেশজুড়ে প্রতিবাদে রূপান্তরিত হয়। সরকার ও মানবাধিকার গোষ্ঠীর তথ্যের পার্থক্য সত্ত্বেও, অস্থিরতা বাড়তে থাকে এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া তীব্রতর হয়।
মুদ্রাস্ফীতির তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোজগার কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চাপ বাড়ে। এই আর্থিক সংকটের প্রতিক্রিয়ায়, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদাররা ডলার-রিয়াল রেটের তীব্র পতনের পর ধর্মঘট শুরু করে, যা দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ধর্মঘটের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমে আসে, এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মুখোমুখি হয়। কয়েক দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার করা গুলির ফলে প্রাণহানি ও আঘাতের সংখ্যা বাড়ে।
প্রতিবাদে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানবাধিকার গোষ্ঠী হেঙ্গাও অনুযায়ী, এই সপ্তাহের মধ্যে অন্তত সতেরো জনের মৃত্যু হয়েছে, আর হরানা গোষ্ঠী ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৮২ জনের গ্রেপ্তার জানিয়েছে। সরকারের আনুষ্ঠানিক হিসাবের মতে, অস্থিরতায় এখন পর্যন্ত দশজনের বেশি মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। যদিও বিভিন্ন সূত্রে সংখ্যা ভিন্ন, তবে সকলেই স্বীকার করে যে প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই পরিস্থিতিতে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি মোকাবিলার পরিবর্তে প্রতিবাদকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করার নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, সমস্যার সমাধানের জন্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংলাপের প্রয়োজন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত জোরদারির পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সমাধান খোঁজা উচিত। এই নির্দেশনা দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সুরকে পূর্বের তুলনায় নরম করে তুলেছে।
ইরানের পুলিশ প্রধান আহমদ-রেজা রাদান জানিয়েছেন, তেহরান শহরে একা চলমান নিরাপত্তা অভিযানে চলতি সময়ে চল্লিশজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গ্রেপ্তারের বেশিরভাগই প্রতিবাদে নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি, যাদের কার্যক্রমকে নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কিছুকে তদন্তের জন্য জেলখানায় স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই প্রতিবাদকে ২০২২ সালে কুর্দি তরুণী মাশা আমিনির মৃত্যুর পরের সর্ববৃহৎ আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমান আন্দোলনের তীব্রতা ও পরিসরে ২০২২ সালের তুলনায় কিছুটা কম। তবুও, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষের সমন্বয় এইবারের প্রতিবাদকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে, ডলার-রিয়াল রেটের রেকর্ড পতন দেশের মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা বাড়িয়েছে। গ্র্যান্ড বাজারের দোকানদারদের ধর্মঘটের মূল দাবি ছিল মুদ্রা হারের স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। এই অর্থনৈতিক চাহিদা, সামাজিক অসন্তোষের সঙ্গে মিলে, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
রাজনৈতিক দিক থেকে, সরকারী সুরের নরমতা এবং প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংলাপের আহ্বান ভবিষ্যতে কী ধরনের নীতি পরিবর্তন আনবে তা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। মানবাধিকার গোষ্ঠীর দাবি অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ও মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে তৎক্ষণাৎ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে, নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত জোরদারির পরিবর্তে অর্থনৈতিক নীতি সমন্বয় এবং মুদ্রা বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা হবে কি না, তা পরবর্তী সপ্তাহে স্পষ্ট হবে।
অবশেষে, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ইরানের বর্তমান অস্থিরতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকট হিসেবে উল্লেখ করছেন, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সরকার যদি সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে পারে, তবে অস্থিরতা কমে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায়, নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত জোরদারির ফলে আরও বেশি প্রাণহানি ও গ্রেপ্তার হতে পারে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলবে।



