শুক্রবার রাতের পরেই, শনিবার (৩ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন করা হয়। মেলাটি রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচল ৪ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে (বিবিসিএফইসি) অনুষ্ঠিত হয়। এটি একই স্থানে পঞ্চমবারের মতো মেলা আয়োজন, যা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন মেলাটিকে দেশের উদ্যোগ, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মেলাটি কেবল পণ্যের প্রদর্শনী নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার, নতুন পণ্য রপ্তানি বাড়ানোর এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কৌশলগত প্ল্যাটফর্ম।
বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, মেলার মাধ্যমে দেশের রপ্তানি পণ্যের গুণগত মান ও বৈচিত্র্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপিত হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মেলায় প্রদর্শিত উদ্ভাবনী পণ্য ও উৎপাদন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করতে পারবেন।
মেলাটির লক্ষ্য ভোক্তা, উদ্যোক্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক অংশীদারদের সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা। এ ধরনের সংযোগ উৎপাদনের বহুমুখীকরণকে ত্বরান্বিত করবে, ফলে দেশের রপ্তানি পণ্যের পরিসর বিস্তৃত হবে এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে। মেলায় দেশীয় ও বিদেশি পর্যটক, ব্যবসায়িক প্রতিনিধি এবং আমদানিকারকদের জন্য পণ্য প্রদর্শনের সুযোগ প্রদান করা হয়েছে, যা বাণিজ্যিক লেনদেনের পরিমাণ বাড়াতে সহায়ক হবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইপিবি ভাইস চেয়ারম্যান (প্রধান নির্বাহী) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুর রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতি মেলাটির সরকারি সমর্থন ও নীতি দিকনির্দেশনার গুরুত্বকে তুলে ধরেছে।
এই বছর মেলায় মোট ১১টি বিদেশি দেশ অংশগ্রহণকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের পরিসর বাড়িয়ে তুলেছে। বিদেশি স্টলগুলোতে প্রধানত টেক্সটাইল, জুয়েলারি, হস্তশিল্প এবং কৃষি পণ্য প্রদর্শিত হবে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি পোর্টফোলিওকে সমৃদ্ধ করবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেলাটির প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন চুক্তি, সরবরাহ চেইন পার্টনারশিপ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের সুযোগ পাবে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের বাজারে প্রবেশের দরজা খুলে দেবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে মেলাটি দেশের রপ্তানি কৌশলকে পুনর্গঠন করার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। বৈচিত্র্যপূর্ণ পণ্য লাইনআপ এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান মেলার মাধ্যমে ত্বরান্বিত হবে, যা রপ্তানি আয়কে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে। এছাড়া, মেলায় প্রদর্শিত পণ্যের গুণগত মান ও উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্য আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা জোগাবে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে পুনরাবৃত্তি অর্ডার এবং স্থায়ী ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মেলাটির সফলতা দেশের বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডিংকে শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ইতিবাচক চিত্র গড়ে তুলবে। এটি কেবল রপ্তানি বৃদ্ধিই নয়, বরং দেশীয় উৎপাদনের মানোন্নয়ন, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকীকরণে উৎসাহ দেবে।
মেলার পরবর্তী পর্যায়ে, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারী নীতি সমর্থন, আর্থিক সহায়তা এবং রপ্তানি প্রমোশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে আরও উন্নত পরিবেশ প্রদান করা হবে বলে আশা করা যায়। এ ধরনের সমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের বাণিজ্যিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দৃঢ় করবে।
সারসংক্ষেপে, ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা দেশের বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি, রপ্তানি কৌশল এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। মেলার মাধ্যমে উৎপাদনের বৈচিত্র্য, পণ্যের গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং শক্তিশালী হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সরাসরি অবদান রাখবে।



