মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনওয়ার ইব্রাহিম সোমবার ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পর মন্ত্রিসভার ও সরকারি কর্মীদের সামনে জানিয়েছেন যে, তিনি এই বছর সংসদে একটি আইন প্রস্তাব করবেন যা প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দশ বছর, অর্থাৎ দুই পূর্ণ মেয়াদে সীমাবদ্ধ করবে। তিনি উল্লেখ করেন, ক্ষমতার দৌড়ে কেউই অনন্তকাল বসে থাকতে পারে না; প্রত্যেকেরই একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে।
আনওয়ার বিশেষ নববর্ষের ঘোষণায় বলেন, “প্রধানমন্ত্রী সহ সকল সরকারি কর্মকর্তার জন্য মেয়াদ সীমা নির্ধারণ করা উচিত, যাতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা না হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে স্থান পায়।” তিনি আরও যুক্তি দেন, মেয়াদ শেষের পর ক্ষমতা হস্তান্তর করা দেশের রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য উপকারী হবে।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় কোনো মেয়াদ সীমা নেই। পূর্বের প্রধানমন্ত্রী মহাতির মোহাম্মদ ২২ বছর ধরে প্রথম মেয়াদে শাসন করেছেন এবং ২০০৩ সালে পদত্যাগ করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি অবসর থেকে ফিরে এসে বিরোধী জোটের নেতৃত্বে সরকারকে উৎখাত করে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন, তখন তিনি ৯২ বছর বয়সে বিশ্বের সর্ববয়স্ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
আনওয়ার এই মেয়াদ সীমা আইন কখন সংসদে আনবেন তা স্পষ্ট করেননি, তবে তিনি জানিয়েছেন যে, বছরের প্রথম সংসদ সেশন এই মাসে অনুষ্ঠিত হবে। তার দল প্যাকাটান হারাপান (আশার জোট) ২০২২ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করার কথা উল্লেখ করেছিল।
প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমা সংক্রান্ত প্রস্তাবের পাশাপাশি, আনওয়ার সরকার তথ্য স্বচ্ছতা বাড়াতে ফ্রিডম অফ ইনফরমেশন বিল এবং দুর্নীতি মোকাবেলায় ওম্বুডসম্যান অফিস প্রতিষ্ঠার আইনও সংসদে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করেছে। তিনি বলেন, ওম্বুডসম্যানের মাধ্যমে জনগণ যে কোনো স্তরের সরকারি কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ উত্থাপন করতে পারবে, এবং সব স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
এই ঘোষণার পর বিরোধী দল ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা কিছুটা সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তি দেন, মেয়াদ সীমা নির্ধারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক নীতি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিশেষ করে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনা দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। তবে আনওয়ার এই উদ্বেগগুলোকে অগ্রাহ্য করে বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের জন্য অপরিহার্য।
মালয়েশিয়ার উচ্চ আদালত সম্প্রতি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রজাককে অতিরিক্ত ১৫ বছর কারাদণ্ড প্রদান করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়। এই সিদ্ধান্তের পর সরকার দুর্নীতি মোকাবেলায় আরও শক্তিশালী আইনি কাঠামো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আনওয়ারের মেয়াদ সীমা ও তথ্য স্বচ্ছতা সংক্রান্ত উদ্যোগগুলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কারকে ত্বরান্বিত করবে কিনা তা সময়ই বলবে। তবে স্পষ্ট যে, সরকার এখনো দীর্ঘমেয়াদী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং জনগণের অধিকারের সুরক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী মেয়াদ সীমা সংক্রান্ত আইন যদি সংসদে গৃহীত হয়, তবে তা মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে, যা ভবিষ্যতে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবেশকে প্রভাবিত করবে।
এই প্রস্তাবের বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর পারদর্শিতা দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।



