রবিবার মিডিয়ায় পাঠানো যৌথ বিবৃতিতে দেশের শীর্ষ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ও এনজিও নেতারা সরকার প্রস্তাবিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্কতা প্রকাশ করেছেন। তারা উল্লেখ করেন, যদিও ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক, তবে খসড়া অধ্যাদেশের কাঠামো ও লক্ষ্যক্ষেত্র বর্তমান ক্ষুদ্রঋণ খাতের বাস্তবতা ও অর্জনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সরকারের প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংকে রূপান্তর করার ধারা অন্তর্ভুক্ত, যা মুনাফাভিত্তিক ব্যাংকিং মডেলকে অলাভজনক, দরিদ্রবান্ধব ক্ষুদ্রঋণ সেবার সঙ্গে একত্রিত করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সংস্থাগুলো এই রূপান্তরকে বাস্তবসম্মত না বলে বিবেচনা করে, এতে ‘মিশন ড্রিফট’ ঘটার সম্ভাবনা উল্লেখ করে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে; বিপরীতে ব্যাংক একটি লাভজনক কাঠামো অনুসরণ করে। এই পার্থক্যকে অগ্রাহ্য করে রূপান্তরের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে ক্ষুদ্রঋণ সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী নেতাদের মধ্যে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, আশার প্রেসিডেন্ট মো. আরিফুল হক চৌধুরী, বুরো বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, টিএমএসএসের নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিসেসের ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক সন্তোষ পাল, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের নির্বাহী পরিচালক মো. আলাউদ্দিন খান, সাজেদা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাহিদা ফিজ্জা কবির, অন্তর সোসাইটি ফর ডেভেলপমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা মো. এমরানুল হক চৌধুরী ইত্যাদি ১৭টি শীর্ষ উন্নয়ন ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা অন্তর্ভুক্ত।
তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কার্যপ্রণালী, ঋণ শর্তাবলী ও গ্রাহক সেবা মডেলকে ব্যাংকিং সিস্টেমে রূপান্তর করা হলে গ্রাহক সুরক্ষা, সুদের হার এবং ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। এই পরিবর্তনগুলো যদি যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রিত না হয়, তবে ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্রঋণ খাতের মোট ঋণ পরিমাণ দেশের মোট ঋণ বাজারের প্রায় ২০% গঠন করে। যদি এই সেক্টারকে ব্যাংকিং কাঠামোতে সংযুক্ত করা হয়, তবে ঋণ সরবরাহের গতি ও শর্তাবলীতে পরিবর্তন আসতে পারে, যা মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠানগুলোর লাভজনকতা ও টেকসইতাকে প্রভাবিত করবে।
অধিকন্তু, রূপান্তর প্রক্রিয়ার সময় বিদ্যমান ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পুনর্গঠন, ডিফল্ট রেট এবং পুনরায় ঋণ গ্রহণের সুযোগে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। এই অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে এবং ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার মূলধন সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে ব্যাংক লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত মূলধন ও রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা বর্তমান ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে নেতারা উল্লেখ করেন। ফলে, অনেক সংস্থা অতিরিক্ত মূলধন সংগ্রহের চাপের মুখে পড়তে পারে, যা তাদের মূল মিশন থেকে বিচ্যুতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
বিবৃতি প্রকাশের পর সরকারী দফতর থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সংশোধনী প্রস্তাবনা এখনো প্রকাশিত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে দাবি করা হচ্ছে, যাতে অধ্যাদেশের খসড়া পুনর্বিবেচনা করে ক্ষুদ্রঋণ খাতের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও সামাজিক মিশনকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে এই ধরনের নীতিগত পরিবর্তন যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তবে ক্ষুদ্রঋণ সেক্টরের ঋণ প্রবাহে হ্রাস, গ্রাহক আস্থা হ্রাস এবং দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের ধীরগতি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করছেন। একই সঙ্গে, যদি রূপান্তর প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিতভাবে সম্পন্ন হয়, তবে ব্যাংকিং সেক্টরের পুঁজি প্রবেশ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সারসংক্ষেপে, শীর্ষ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা ও এনজিও নেতারা সরকারকে অনুরোধ করছেন, যাতে ক্ষুদ্রঋণ ব্যাংক অধ্যাদেশের খসড়া পুনরায় পর্যালোচনা করে, মিশন ড্রিফটের ঝুঁকি কমিয়ে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সেবা অব্যাহত রাখা যায় এবং সেক্টরের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।



