দিল্লির ২০২০ সালের দাঙ্গার পর আরোপিত সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারবিহীনভাবে আটক থাকা উমর খালিদ ও শারজিল ইমামকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সোমবার বেইল প্রত্যাখ্যান করেছে। উভয়কে দাঙ্গার সময় সশস্ত্র সংঘর্ষ উস্কে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যেখানে ৫৩ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছিল, অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্য। আদালত বেইল আবেদন পুনর্বিবেচনা না করে, তাদের পুনরায় আবেদন এক বছরের পর পর্যন্ত অনুমোদন করবে না।
সুপ্রিম কোর্টের দুইজন বিচারক সমন্বিত বেঞ্চে বেইল আবেদনগুলো পৃথকভাবে বিবেচনা করার নির্দেশ দেন, কারণ অভিযুক্তদের অপরাধের মাত্রা ও দায়িত্ব সমান নয় বলে তারা যুক্তি দেন। একই মামলায় আটক থাকা পাঁচজন সহ-অভিযুক্তকে বেইল প্রদান করা হলেও, খালিদ ও ইমামের ক্ষেত্রে আদালত তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে অন্যদের তুলনায় বেশি গুরুতর বলে গণ্য করেছে। ফলে দুইজনের বেইল প্রত্যাখ্যানের সঙ্গে সঙ্গে তারা আরেক বছর পর্যন্ত পুনরায় আবেদন করতে পারবে না।
উমর খালিদ ২০১৯ সালে দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, আর শারজিল ইমাম গ্রেফতারের সময় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরাল গবেষক ছিলেন। দুজনের বয়স ৩৭ বছর, এবং তারা উভয়ই ছাত্র আন্দোলনের বিশিষ্ট মুখ হিসেবে পরিচিত। তাদের শিক্ষাগত পটভূমি ও রাজনৈতিক কার্যক্রমের কারণে এই মামলাটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক মনোযোগ পেয়েছে।
২০২০ সালের দাঙ্গা, যা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) বিরোধী দীর্ঘমেয়াদী প্রতিবাদে উত্তেজিত হয়েছিল, তাতে ৫৩ জনের বেশি প্রাণ হারায়, যার বেশিরভাগই মুসলিম ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘ এই আইনকে “মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক” বলে সমালোচনা করে। দাঙ্গার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী খালিদ ও ইমামসহ বেশ কয়েকজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে গ্রেফতার করে, যা বেইল পাওয়া কঠিন করে তুলেছে।
বেঞ্চের রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খালিদ ও ইমামের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো অন্য অভিযুক্তদের তুলনায় বেশি তীব্র এবং সুতরাং তাদের বেইল প্রত্যাখ্যান করা যুক্তিযুক্ত। আদালত ভবিষ্যতে তাদের বেইল আবেদন পুনরায় বিবেচনা করতে পারে, তবে তা এক বছরের অন্তরই সম্ভব হবে। এই সিদ্ধান্তের ফলে দুইজনের প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশন আরও এক বছর বাড়বে।
মামলাটির আন্তর্জাতিক মাত্রা স্পষ্ট হয়েছে, যখন অক্টোবর ২০২২-এ একটি রিপোর্টে প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, তিনজন অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতি এবং প্রাক্তন ফেডারেল হোম সেক্রেটারিরা উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসচারী অভিযোগ প্রমাণের অভাব রয়েছে। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কংগ্রেস সদস্য ও সেনেটর ভারতীয় দূতাবাসে চিঠি লিখে দীর্ঘমেয়াদী প্রি-ট্রায়াল ডিটেনশনের প্রতি “চলমান উদ্বেগ” প্রকাশ করেন।
এই আন্তর্জাতিক উদ্বেগের পরেও, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের বেইল প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, যা তাদের অধিকার সংরক্ষণে আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ুকে নির্দেশ করে। ভবিষ্যতে তারা এক বছর পর পুনরায় বেইল আবেদন করতে পারবে, তবে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে তা অনুমোদিত হবে কিনা তা অনিশ্চিত। এই রায়ের ফলে ভারতের মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা আবারও দেশের আইনি ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সামগ্রিকভাবে, দাঙ্গা মামলায় দুইজন প্রধান ছাত্র নেতা বেইল না পেয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য জেলখানায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন, আর একই মামলায় অন্য পাঁচজনের বেইল অনুমোদিত হয়েছে। এই পার্থক্য ভবিষ্যতে আইনি নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগে কীভাবে প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।



