রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি কমিয়ে চলা কিছু কোম্পানি আবার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে, সক্রিয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত আমদানি করার জন্য বারবার আবেদন জানায়, কিন্তু অনুমোদন না পেয়ে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি দেখা দেয়।
এই ঘাটতির ফলে গ্রাহকরা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করেও গ্যাসের সিলিন্ডার পাননি। ব্যবসায়িক গোষ্ঠী সরকারকে এই পরিস্থিতির মূল দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করে, দাবি করে যে তাদের অতিরিক্ত আমদানি অনুমোদন না দেওয়াই সংকটের মূল কারণ।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) জানায়, দেশে মোট ২৮টি সংস্থা এলপিজি ব্যবসা করে, যার মধ্যে ২৩টি সংস্থার কাছে আমদানি অনুমোদন রয়েছে। তবে বর্তমানে প্রধানত ছয়টি কোম্পানি অধিকাংশ গ্যাস সরবরাহ করে, আর চারটি সীমিত পরিমাণে আমদানি করে। বাকি সংস্থাগুলো গত ডিসেম্বর মাস থেকে কোনো গ্যাসই আমদানি করেনি।
অনুমোদিত পরিমাণের বাইরে গ্যাস আনা নিষিদ্ধ, তাই কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত আমদানি করতে পারছে না। একই সঙ্গে, কিছু সংস্থা তাদের বরাদ্দের চেয়ে কম গ্যাসই আমদানি করছে; এদের মধ্যে একটি বড় কোম্পানি গত এক বছর ও অর্ধেকেরও বেশি সময়ে আমদানি হ্রাসের মুখে।
অন্যদিকে, ব্যাংক লেনদেনের জটিলতা কিছু সংস্থার গ্যাস আমদানি পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। ঋণের কিস্তি পরিশোধে সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় তারা আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব সমস্যার ফলে বাজারে গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি আরও বাড়ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, গ্যাসের কোনো সংকট নেই; বরং খুচরা বিক্রেতারা বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ভ্রাম্যমাণ অভিযান চালু করা হবে এবং ব্যবসায়ীদের আমদানি বাড়ানোর অনুমতি দেওয়ার জন্য বেসরকারি ইলেকট্রিক রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) পদক্ষেপ নেবে।
মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি প্রায় দুই বছর ধরে অতিরিক্ত আমদানি অনুমোদনের জন্য জ্বালানি বিভাগের দরজায় ঘুরছে। সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, তাদের চারটি গ্যাস ভর্তি প্ল্যান্ট রয়েছে, যার মধ্যে মেঘনাঘাটের বড় প্ল্যান্টে বছরে ২.৫ লাখ টন গ্যাস আমদানি করার অনুমতি আছে। তদুপরি, একই প্ল্যান্টে অতিরিক্ত এক লাখ টন গ্যাস আনার সক্ষমতা রয়েছে।
মেঘনা গ্রুপের অন্যান্য প্ল্যান্টগুলোও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে পারে; মোংলায় ৯০ হাজার টন, বগুড়া ও ভালুকায় প্রত্যেকটি ৬০ হাজার টন গ্যাসের ক্ষমতা রয়েছে। তবে অনুমোদন না পেলে এই ক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।
অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘায়ু এবং নির্দিষ্ট কোটার সীমাবদ্ধতা ব্যবসায়িক সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দাবি করে, যদি অতিরিক্ত গ্যাস আমদানি করার অনুমতি দেওয়া হতো, তবে বর্তমান সরবরাহ সংকট এড়ানো যেত।
সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট নীতি প্রকাশ করা হয়নি যে কীভাবে কোটার পুনর্বিবেচনা করা হবে বা অতিরিক্ত আমদানি অনুমোদনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হবে। ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা বজায় রয়েছে এবং গ্রাহকদের গ্যাসের দাম ও প্রাপ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন, যদি গ্যাসের সরবরাহের ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকে, তবে গৃহস্থালির রান্নার গ্যাসের দাম বাড়তে পারে এবং গ্যাস সিলিন্ডারের ঘূর্ণন সময় কমে যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি ভোক্তাদের জন্য আর্থিক চাপ বাড়াবে।
সামগ্রিকভাবে, এলপিজি বাজারে বর্তমান অবস্থা অনুমোদন প্রক্রিয়ার অদক্ষতা, নির্দিষ্ট কোটার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাংক লেনদেনের জটিলতার সমন্বয়ে গঠিত। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন, যাতে গ্যাসের সরবরাহ স্থিতিশীল হয় এবং গ্রাহকদের অতিরিক্ত খরচ থেকে রক্ষা করা যায়।



