হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেক্টরের শ্রমিক সংগঠন আগামী ১৪ জানুয়ারি (বুধবার) থেকে দেশব্যাপী কর্মবিরতি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি গেজেটের বাস্তবায়ন, নিয়োগপত্র‑পরিচয়পত্র প্রদান, ৮ ঘণ্টা কাজের শর্ত নিশ্চিত করা এবং পূর্বে স্বাক্ষরিত সব চুক্তি কার্যকর করা।
বক্তা আক্তারুজ্জামান খান, সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, জানুয়ারি ৫ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, মৌলিক পণ্যের দামের ধারাবাহিক বৃদ্ধি শ্রমিকদের জীবনের কঠিনতা বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে হোটেল‑রেস্তোরাঁ কর্মীরাও অন্য শ্রমিকদের মতোই আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
হোটেল মালিকদের দিক থেকে দেখা যায়, যদিও খাবারের দাম নিয়মিত বাড়ছে, তবু শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি, নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হচ্ছে না। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের ১২‑১৩ ঘণ্টা কাজ করানো হচ্ছে, যদিও বাংলাদেশ শ্রম আইন‑২০০৬ অনুযায়ী ৮ ঘণ্টার পর অতিরিক্ত কাজের জন্য দ্বিগুণ মজুরি প্রদান বাধ্যতামূলক।
এই অবস্থা সত্ত্বেও, সরকার, মালিক এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক ত্রিপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবে সেগুলোর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ মে সরকার হোটেল‑রেস্তোরাঁ সেক্টরের জন্য ন্যূনতম মজুরির চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করলেও, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে তা এখনও কার্যকর হয়নি, যা শ্রম অধ্যাদেশ‑২০২৫ অনুসারে দণ্ডনীয় অপরাধ।
আক্তারুজ্জামান খান অতিরিক্তভাবে উল্লেখ করেন, ২০ অক্টোবর ও ১৮ ডিসেম্বর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে, এবং ২৪ ডিসেম্বর ত্রিপক্ষীয় সভা অনুষ্ঠিত হলেও সরকার ও মালিক পক্ষের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই অবহেলা শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ফলস্বরূপ, সংগঠনটি দেশের সব হোটেল ও রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠানে সমন্বিত কর্মবিরতি আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছে। এই কর্মসূচি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং গণমাধ্যমের সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে।
হোটেল‑রেস্তোরাঁ শিল্পের জন্য এই কর্মবিরতি উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক প্রভাব ফেলবে। খাবার ও পানীয় সরবরাহের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হলে গ্রাহক সন্তুষ্টি কমবে, রিজার্ভেশন বাতিল হবে এবং পর্যটন সেক্টরের আয় হ্রাস পাবে। বিশেষ করে বড় শহর ও পর্যটন কেন্দ্রের হোটেলগুলোতে রুম দখল হার কমে যাবে, যা স্বল্পমেয়াদে নগদ প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করবে।
বাজারে বিনিয়োগকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, শ্রমিকদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শিল্পে অনিশ্চয়তা বজায় থাকবে। শেয়ারবাজারে হোটেল সংক্রান্ত স্টকের মূল্য হ্রাস পেতে পারে, আর বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীর সংখ্যা হ্রাস পেলে দীর্ঘমেয়াদে সেক্টরের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ও কাজের সময়ের শর্ত মেনে চলা না হলে শ্রমিক অধিকার সংরক্ষণে আইনগত পদক্ষেপের সম্ভাবনা রয়েছে। যদি সরকার গেজেটের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত না করে, তবে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আইনি চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে, যা শিল্পের অপারেশনাল ব্যয় বাড়াবে।
এই পরিস্থিতিতে হোটেল মালিকদের জন্য জরুরি পদক্ষেপ হল, শ্রমিকদের সঙ্গে পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি, নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্রের বিষয়টি সমাধান করা এবং ৮ ঘণ্টা কাজের শর্ত মেনে চলা। এভাবে শ্রমিকদের সন্তুষ্টি বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে, এবং সম্ভাব্য কর্মবিরতির ক্ষতি কমানো যাবে।
সেক্টরের ভবিষ্যৎ প্রবণতা নির্ভর করবে সরকারী নীতি বাস্তবায়নের গতি ও শ্রমিক সংগঠনের সমন্বিত পদক্ষেপের উপর। যদি গেজেটের পূর্ণ কার্যকরীতা নিশ্চিত হয়, তবে শ্রমিকদের আয় বৃদ্ধি পাবে, যা ভোক্তা ব্যয়ের বাড়তি চাহিদা সৃষ্টি করে হোটেল‑রেস্তোরাঁ ব্যবসার পুনরুজ্জীবন ঘটাতে পারে। অন্যথায়, দীর্ঘমেয়াদী বিরতি ও শ্রমিক অসন্তোষ শিল্পের সুনাম ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
সংক্ষেপে, ১৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া কর্মবিরতি হোটেল‑রেস্তোরাঁ সেক্টরের কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ব্যাঘাত ঘটাবে, শ্রমিকদের মৌলিক দাবির পূরণ না হলে শিল্পের আয় ও বিনিয়োগের পরিবেশ ঝুঁকির মুখে পড়বে। সময়মত সমাধান না হলে, সেক্টরের পুনরুদ্ধার দীর্ঘ সময় নিতে পারে।



