শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার তিলই গ্রাম থেকে ২০ বছর আগে নিজস্ব ওষুধের দোকান চালু করা খোকন চন্দ্র দাসকে গত বুধবার রাত ৯টা অর্ধেকের দিকে পেট্রল‑জাতীয় তরল দিয়ে গায়ে জ্বালিয়ে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থল ছিল কনেশ্বর ইউনিয়নের তিলই এলাকা, যেখানে সন্দেহভাজন তিনজন ব্যক্তি তাকে গুলি না করে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। দহনের পর দাসকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তৎক্ষণাৎ রক্ত সঞ্চালন ও শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা প্রদান করা হয়, তবে পরের দিনই ঢাকা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চলাকালীনই দাসের শ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং তিনি হাসপাতালে মারা যান।
খোকন চন্দ্র দাসের ব্যবসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালে, যখন তিনি কেউরভাঙা বাজারে একটি ছোট ওষুধের দোকান খুলেছিলেন। সময়ের সাথে সাথে তিনি দোকানের ভিতরে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা চালু করেন, যা স্থানীয় গ্রাহকদের আর্থিক লেনদেনে সহায়তা করে এবং তার পরিবারের আয় বাড়িয়ে দেয়। দাসের স্বামী ও সন্তানরা তার ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত আয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল, এবং তার মৃত্যুর পর পরিবারটি আর্থিকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
আক্রমণটি ঘটার সময় দাস একা দোকানে কাজ করছিলেন। সন্দেহভাজন তিনজন ব্যক্তি—সোহাগ খান (২৮), রাব্বি মোল্যা (২৪) এবং পলাশ সরদার (২৫)—দোকানের দরজায় ঢুকে তাকে গায়ে পেট্রল‑তরল ছিটিয়ে দেয় এবং শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করে। দাসকে তৎক্ষণাৎ গৃহস্থালীর লোকজনের সাহায্যে গাছি দিয়ে নিক্ষেপ করা হয়, তবে দহনের তীব্রতা তাকে গুরুতরভাবে আহত করে।
দামুড্যা থানায় ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে মামলাটি দাখিল করা হয়। দাসের বাবা, পরেশ চন্দ্র দাস, বৃহস্পতিবার রাতেই মামলাটি দায়ের করেন এবং সন্দেহভাজন তিনজনের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক অভিযোগ আনা হয়। পরের দিনই র্যাব কিশোরগঞ্জ থেকে পুলিশ দলটি সংশ্লিষ্ট তিনজনকে গ্রেপ্তার করে, এবং তারা ডামুড্যা থানা গৃহীত হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে হিংসা, দহন এবং হত্যার অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরেশ চন্দ্র দাসের বিবৃতি অনুযায়ী, তিনি বয়সের কারণে একা চলতে পারেন না এবং তার একমাত্র সন্তান খোকনই তার জীবনের শেষ অবলম্বন ছিল। দাসের মৃত্যুর পর তিনি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন এবং ভবিষ্যতে কীভাবে বেঁচে থাকবে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আরও জানান যে, সন্দেহভাজনরা তাদের এলাকার বাসিন্দা এবং ভবিষ্যতে আবার কোনো আক্রমণ ঘটতে পারে বলে তিনি ভয় পেয়েছেন।
ডামুড্যা থানার প্রধান পুলিশ অফিসার মামলার তদন্তে বলছেন, প্রাথমিক তদন্তে সন্দেহভাজন তিনজনের পরিচয় এবং তাদের অপরাধের পদ্ধতি স্পষ্ট হয়েছে। গৃহীত সাক্ষ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং দহনের জন্য ব্যবহৃত পেট্রল‑তরলের বিশ্লেষণ প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে অতিরিক্ত সন্দেহভাজন বা সহায়ক ব্যক্তির সন্ধান করা হবে এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খোকন চন্দ্র দাসের মৃত্যুর ফলে তার পরিবারে আর্থিক অনিশ্চয়তা বাড়ে। তার স্ত্রী সীমা দাস এবং সন্তানরা এখন কোনো আয় উৎস ছাড়াই বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন। দাসের দোকানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় গ্রাহকদের আর্থিক সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে, যা এলাকার অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয় সমাজে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়া তীব্র। বহু বাসিন্দা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং পুলিশকে দ্রুত এবং কঠোরভাবে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য দাসের পরিবারকে সহায়তা করার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন।
আইনি দিক থেকে, মামলাটি বর্তমানে ডামুড্যা থানা থেকে শাখা আদালতে পাঠানো হয়েছে, যেখানে অপরাধের প্রমাণ এবং সন্দেহভাজনদের পূর্ব অপরাধের রেকর্ড বিবেচনা করে চূড়ান্ত রায় দেওয়া হবে। আদালতের রায়ের পর দাসের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বা অন্যান্য আইনি সহায়তা প্রদান করা হতে পারে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি নিরাপত্তা ব্যবস্থা শক্তিশালী করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে বাজার ও ব্যাবসায়িক এলাকায় রাতের সময় গমনাগমন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ পেট্রোলিং চালু করা হবে। একই সঙ্গে, স্থানীয় জনগণকে কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপের তথ্য দ্রুত জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন হিংসাত্মক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।



