শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঠান্ডাজনিত রোগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তিন সপ্তাহের ধারাবাহিক শৈত্যপ্রবাহে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং ডায়রিয়া রোগের সংখ্যা বাড়ে, যা হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দুই মাসের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ ও ডায়রিয়া রোগে প্রায় এক লাখ মানুষ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে ঠান্ডা-সৃষ্ট জটিলতার কারণে অন্তত ৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশে জানা যায়, উল্লিখিত সময়ে মোট ৯৮,৭৪১ রোগী ঠান্ডাজনিত জটিলতার কারণে ভর্তি হয়েছে। এদের মধ্যে শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সংক্রমণে আক্রান্ত ২৯,৫৫৫ রোগী ছিলেন, যার মধ্যে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৬৯,১৮৬, যার মধ্যে ৬ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগে শ্বাসযন্ত্রের রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ, আর চট্টগ্রাম বিভাগে ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই বৈষম্য অঞ্চলভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
শিশু রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় দেখা গেছে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, শীতের প্রভাবে শিশু রোগীর সংখ্যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধির পেছনে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অপর্যাপ্ততা এবং শীতের তীব্রতা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, শীতের সময় শ্বাসনালির স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হ্রাস পায়, ফলে নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কিওলাইটিস এবং ডায়রিয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ ধরনের রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের গুরুত্ব জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও শিশু রোগীর সংখ্যা ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। হাসপাতালের পরিচালনা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম শিশুদের বিশেষভাবে উষ্ণ রাখা এবং রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই নিকটস্থ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর শীতের শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি জটিল থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছে। নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত, এটাই প্রধান সুপারিশ।
এছাড়া, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে অতিরিক্ত রোগীর প্রবাহ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এতে জরুরি কক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ওষুধের স্টক নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য কর্মীদের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত।
শীতের মৌসুমে বাড়িতে উষ্ণতা বজায় রাখা, সঠিক পুষ্টি গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের জন্য গরম পোশাক এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
যদি শ্বাসকষ্ট, উচ্চ জ্বর, কাশি বা ডায়রিয়া মত লক্ষণ দেখা দেয়, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা রোগের গুরুতর জটিলতা রোধে কার্যকর।
এই শীতকালীন স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণই মূল চাবিকাঠি।
আপনার পরিবারে কোনো শীতজনিত রোগের লক্ষণ দেখা দিলে, দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আপনার স্বাস্থ্যই আপনার সেরা সম্পদ—এখনই পদক্ষেপ নিন।



