১৯৬৯ সালে ঢাকা শহরকে ঘিরে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে বহু ছাত্র ও নাগরিক প্রাণ হারায়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে কেন্দ্র করে অখতারুজ্জামান এলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়, যা শহরের পুরনো গলিপথ ও সামাজিক চুক্তির ভাঙনকে বর্ণনা করে। উপন্যাসটি প্রকাশের পর থেকে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন দৃষ্টিকোণ যোগ করেছে, যেখানে শহরের স্থাপত্য ও মানুষের মানসিকতা একত্রে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
১৯৬৯ সালের বিদ্রোহের সময় ঢাকা শহরটি গুলির শব্দে ভরে ওঠে, স্লোগান ও রক্তের গন্ধ মিশে যায়। সেই সময়ের ঘটনাগুলি উপন্যাসের প্রথম পৃষ্ঠায়ই প্রকাশ পায়, যেখানে একটি ছাত্রকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এই দৃশ্যটি কেবল ঐ সময়ের কাঁচা বাস্তবতা নয়, বরং শহরের সামাজিক কাঠামোর ভাঙনের সূচনাও নির্দেশ করে।
অখতারুজ্জামান এলিয়াসের জন্ম ১৯৪৩ সালে, এবং তিনি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির গভীর অনুরাগী ছিলেন। তার সাহিত্যিক কর্মে প্রায়শই ঢাকা শহরের পুরনো গলিপথ, ছাদ ঘর ও নিকৃষ্ট নিকাশী নালা উল্লেখ করা হয়েছে, যা শহরের জীবনের অদৃশ্য দিকগুলোকে উন্মোচিত করে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ তেও তিনি একই পদ্ধতিতে শহরের মানসিক মানচিত্র আঁকেন, যা পাঠকদেরকে শহরের প্রতিটি কোণায় প্রবেশের সুযোগ দেয়।
উপন্যাসের কাঠামোতে একাধিক চরিত্রের জীবনকথা একত্রিত হয়েছে, যারা প্রত্যেকেই বিদ্রোহের বিভিন্ন দিককে উপস্থাপন করে। কিছু চরিত্র রূপান্তরিত হয়ে সাহসী লায়ন হয়ে ওঠে, আবার অন্যরা দমিত হয়ে সমাজের গণ্ডি ভাঙতে পারে না। এই বৈপরীত্যই উপন্যাসের মূল থিম, যেখানে সামাজিক চুক্তি ও তার ভাঙনের পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ তে শহরের পুরনো বাড়ি, ছাদ ঘর, সংকীর্ণ গলি ও বন্যা-নিষ্কাশনের নালার বর্ণনা কেবল ভৌত নয়, বরং মানসিক দিক থেকেও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক শহরের প্রতিটি কোণাকে একটি মানসিক ল্যান্ডস্কেপ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যা পাঠকের মনের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলে। এই পদ্ধতিকে কিছু সমালোচক ‘সাইকোগ্রাফি’ বলে উল্লেখ করেন, যদিও তারা সরাসরি কোনো নাম উল্লেখ করেন না।
উপন্যাসের প্রকাশের সময় কিছু সমালোচক এটিকে অতিরিক্ত রোমান্টিকাইজেশন বলে সমালোচনা করেন, তারা যুক্তি দেন যে বাস্তব ঘটনার চেয়ে কল্পনার ছাপ বেশি। তবে অন্যদিকে, বহু পণ্ডিত ও পাঠক এই রচনাকে বাংলা জাতীয় চেতনার পুনর্জাগরণ হিসেবে প্রশংসা করেন, কারণ এটি ১৯৬৯ সালের বিদ্রোহের মূল সত্তা ও তার পরবর্তী প্রভাবকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
‘চিলেকোঠার সেপাই’ তে ব্যবহৃত ভাষা ও বর্ণনা শৈলী আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়। লেখকের শহরের প্রতি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি ও তার সামাজিক বিশ্লেষণ ক্ষমতা পাঠকদেরকে ঐতিহাসিক ঘটনার নতুন দৃষ্টিকোণ দেয়। এই দৃষ্টিকোণ বর্তমানের রাজনৈতিক আলোচনায়ও প্রাসঙ্গিক, যেখানে শহরের অবকাঠামো ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে বিতর্ক চলছে।
বিগত দশকে ঢাকা শহরের নগরায়ন ও আধুনিকীকরণে ঐতিহাসিক গলিপথের ধ্বংসের ঝুঁকি বেড়েছে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এর মাধ্যমে লেখক যে পুরনো শহরের মানসিক মানচিত্র গড়ে তুলেছেন, তা নগর পরিকল্পনাকারী ও নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে উপন্যাসের রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট, কারণ এটি শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও আধুনিক উন্নয়নের মধ্যে সমতা বজায় রাখার আহ্বান জানায়।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নগুলো পুনরায় উত্থান পাচ্ছে। ‘চিলেকোঠার সেপাই’ এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ নতুন প্রজন্মকে তাদের মূল পরিচয় ও ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারে। তাই এই রচনার রাজনৈতিক গুরুত্ব কেবল অতীতের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং ভবিষ্যৎ নীতি গঠনে প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।
উপন্যাসের প্রকাশের পর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্র এতে বিশেষ করে সাইকোগ্রাফিক বিশ্লেষণ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এই গবেষণাগুলো দেখায় যে শহরের মানসিক দিককে বুঝতে হলে ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বর্ণনার সমন্বয় প্রয়োজন। ফলে, ‘চিলেকোঠার সেপাই’ কেবল সাহিত্যিক রচনা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
সংক্ষেপে, অখতারুজ্জামান এলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ১৯৬৯ সালের বিদ্রোহের কাঁচা বাস্তবতা, শহরের মানসিক মানচিত্র এবং সামাজিক চুক্তির ভাঙনকে একত্রে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে পাঠকরা অতীতের রক্তাক্ত সংগ্রামকে পুনরায় উপলব্ধি করে, এবং বর্তমানের নগর নীতি ও পরিচয় সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন দৃষ্টিকোণ পায়। ভবিষ্যতে এই রচনার প্রভাব রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষিত হবে।



