বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলায় কুকুয়া ইউনিয়নের পূর্ব চুনাখালী গ্রামটি সারা বছর নৌকা তৈরির কাজের জন্য পরিচিত। সূর্যোদয়ের আগে থেকেই কাঠ কাটা, পেরেক ঠোকা ও পৃষ্ঠ মসৃণ করার কাজ শুরু হয়, ফলে গ্রামটির প্রতিটি কোণ থেকে গুঞ্জন শোনা যায়।
এই গ্রামটি আমতলী সদর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এবং বারো মাসের কাজের ধারাবাহিকতা এটিকে ‘নৌকার গ্রাম’ হিসেবে স্থানীয় পরিচিতি এনে দিয়েছে। বরিশাল‑কুয়াকাটা সড়কের পাশে ছোট ছাপড়া ঘরে বারেক হাওলাদার (৭৮) পাঁচটি নৌকা পাশাপাশি তৈরি করছেন, যা এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা প্রকাশ করে।
বারেক হাওলাদার আগে শিক্ষকতা করতেন, তবে বেতনের ঘাটতি তাকে পরিবারিক পেশায় ফিরে আসতে বাধ্য করে। তিনি নৌকা বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন, কিন্তু কাঠ সংগ্রহের কঠিনতা ও উচ্চ খরচের কারণে বিক্রয় থেকে সরে এসে এখন স্থানীয় কোনো ব্যবসায়ীর অধীনে কারিগর হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিটি নৌকা তৈরির জন্য তিনি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা উপার্জন করেন।
গ্রামে মোট ২০‑২৫টি পরিবার নৌকা নির্মাণে যুক্ত, এবং তৈরি নৌকাকে স্থানীয়ভাবে ‘ডিঙি’ বলা হয়। এই ডিঙিগুলো অল্প পানিতে চলতে সক্ষম, ফলে কৃষিকাজ, মাছ ধরা এবং হাটবাজারে যাতায়াতের মতো দৈনন্দিন কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়। নৌকার দাম কাঠের গুণমান ও আকারের ওপর নির্ভর করে, যা পাঁচ হাজার থেকে বিশ হাজার টাকার মধ্যে পরিবর্তিত হয়।
নৌকা তৈরির জন্য দরকারি কাঠের সরবরাহ মূলত চাম্বল, মেহগনি ও রেইনট্রি গাছের মাধ্যমে হয়। এই গাছগুলো পাইকারদের কাছ থেকে ক্রয় করে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কাঠকে চেরাই করে নৌকার উপযোগী করে তোলেন। কাঠের প্রক্রিয়াকরণে সময় ও শ্রমের খরচ যুক্ত থাকলেও, এক সপ্তাহে একজন দক্ষ কারিগর চার থেকে পাঁচটি নৌকা সম্পন্ন করতে সক্ষম।
প্রায় দশ থেকে পনেরো বছর আগে নৌকার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল; তখন এক ব্যবসায়ী সপ্তাহে দশ থেকে বারোটি নৌকা বিক্রি করতেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবহারিক চাহিদা হ্রাস পেয়েছে, যার ফলে উৎপাদন ও বিক্রয় উভয়ই কমে গেছে। এই পতনের ফলে কারিগররা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন, বিশেষত তাদের আয় স্থিতিশীল রাখার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বাজারের এই পরিবর্তন স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। নৌকা নির্মাণে যুক্ত পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ায় তাদের অন্যান্য আয়ের উৎসের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। একই সঙ্গে, কাঠের সরবরাহকারী ও পাইকারদের বিক্রয়েও হ্রাস দেখা যায়, যা পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, নৌকা শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য নতুন বাজারের সন্ধান করা জরুরি। পর্যটন খাতে ছোট নৌকার চাহিদা বাড়লে স্থানীয় কারিগরদের জন্য বিক্রয় বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া, কৃষি ও মাছ ধরার আধুনিকায়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হালকা ও টেকসই নৌকার মডেল তৈরি করলে বাজারের নতুন সেগমেন্টে প্রবেশ করা সম্ভব।
তবে এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ, ডিজাইন উন্নয়ন ও বিপণন সহায়তা প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার ও বাণিজ্য সংস্থাগুলি যদি নৌকা নির্মাতাদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও বাজার সংযোগের ব্যবস্থা করে, তবে শিল্পের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা যাবে।
বর্তমানে নৌকা নির্মাণের মূল উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত কাঠের দামও পরিবর্তনশীল, যা উৎপাদন খরচকে প্রভাবিত করে। কাঠের গুণমান ও পরিমাণের ওপর নির্ভর করে নৌকার মূল্য নির্ধারিত হয়, ফলে দাম ও চাহিদার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
সংক্ষেপে, পূর্ব চুনাখালী গ্রাম নৌকা নির্মাণে ঐতিহ্যবাহী দক্ষতা বজায় রেখেছে, তবে বাজারের চাহিদা হ্রাসের ফলে শিল্পের টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। নতুন বাজার অনুসন্ধান, আধুনিক নকশা ও সরকারি সহায়তা এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার মূল চাবিকাঠি হতে পারে।



