ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ৩ জানুয়ারি শীতল ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্কের একটি বন্দিশিবিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একই সময়ে দেহরক্ষীদের মধ্যে কয়েকজনকে শীতলভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে বলে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ জানিয়েছেন।
মাদুরোর অপহরণে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে পাদ্রিনো লোপেজ ‘কাপুরুষোচিত’ বলে নিন্দা করে, এবং তাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই অপারেশনটি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের সরাসরি আক্রমণ এবং দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানছে।
আক্রমণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ওয়াশিংটন এখন থেকে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ব্যবহার এবং দেশের প্রশাসনিক বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, যেখানে অনেক দেশ এই পদক্ষেপকে অনধিকারিক বলে সমালোচনা করছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রমণের সময় ভেনেজুয়েলার সামরিক কর্মী ও বেসামরিক নাগরিকের কিছু ক্ষতি হয়েছে, তবে সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। পাদ্রিনো লোপেজের মতে, দেহরক্ষীদের গুলিবিদ্ধ করা একটি পরিকল্পিত ও শীতল কাজ, যা মানবিক নীতির লঙ্ঘন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এই ঘটনার প্রতি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘বিপজ্জনক নজির’ হিসেবে উল্লেখ করেন। গুতেরেসের মতে, এমন ধরনের হস্তক্ষেপ ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ৫ জানুয়ারি একটি জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে, যেখানে ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকে সদস্য দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বৈধতা ও প্রভাব মূল্যায়ন করতে হবে।
মাদুরোর অনুপস্থিতিতে, ভেনেজুয়েলার সংবিধান অনুযায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিযুক্ত করা হয়েছে। রদ্রিগেজ মাদুরোকে দেশের একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকার করে, তার শাসনকে সমর্থন জানিয়েছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজ রদ্রিগেজের নেতৃত্বে পূর্ণ সমর্থন প্রকাশ করে, এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখতে নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মাদুরো বর্তমানে নিউইয়র্কের বন্দিশিবিরে ‘মাদক পাচার’ সংক্রান্ত অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে। তার ওপর আরোপিত অভিযোগগুলো আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ভেনেজুয়েলায় এই ঘটনার ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং দেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারী সূত্রগুলো জানাচ্ছে, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বজায় রাখা হবে।
অভ্যন্তরীণভাবে, ভেনেজুয়েলা সরকার দেহরক্ষীদের মৃত্যুর তদন্তের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। একই সঙ্গে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও ঘটনাটির ওপর নজর রাখছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে, এই ঘটনা ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকটকে নতুন মাত্রায় নিয়ে এসেছে, এবং যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বৈধতা ও পরিণতি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিতর্কের সূচনা করেছে। ভবিষ্যতে কী ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা এখনও অনিশ্চিত।



