নাইজেরিয়ার উত্তর‑পূর্বে অবস্থিত জিগাওয়া রাজ্য থেকে ইয়োবি রাজ্যের দিকে যাত্রা করা একটি যাত্রীবাহী নৌকা শনিবার গভীর রাতে উল্টে যায়। এই দুর্ঘটনায় অন্তত ২৬ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আর ১৪ জন এখনও অজানা। নৌকায় মোট ৫৩ জন যাত্রী ছিল বলে জানা যায়, যার মধ্যে ১৩ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে।
দুর্ঘটনা ঘটার পর স্থানীয় জরুরি সেবা বিভাগ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং স্বেচ্ছাসেবী দল ও উদ্ধারকারী কর্মী একত্রে কাজ শুরু করে। তারা প্রথমে মৃতদেহ সংগ্রহ করে, পরে নিখোঁজদের সন্ধানে নৌকা ডুবের স্থান ও আশেপাশের নদীর ধারা পরীক্ষা করে। উদ্ধারকাজ চলাকালীন ১৩ জন যাত্রীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এবং তারা নিকটস্থ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্থানান্তরিত করা হয়।
ইয়োবি রাজ্যের স্টেট ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট এজেন্সির নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ গোজে জানান, নৌকাটি অতিরিক্ত যাত্রী বহন করায় ভারসাম্য হারায় এবং উল্টে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, এখন পর্যন্ত স্বেচ্ছাসেবী ও সরকারি দল ২৬ জনের দেহ উদ্ধার করেছে, আর ১৪ জনের অবস্থান এখনও অজানা। গোজে আরও জানান, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলমান রয়েছে এবং নিখোঁজদের সন্ধানে অতিরিক্ত দল পাঠানো হয়েছে।
নাইজেরিয়ার নদী পথে ঘটিত এমন দুর্ঘটনা দেশজুড়ে সাধারণ ঘটনা। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, নৌকার পুরনো অবস্থা এবং নিরাপত্তা বিধি না মানা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে ইলিশ, গঙ্গা ও ন্যাম্বা নদীর মতো ব্যস্ত জলে এই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটেছে, যেখানে স্থানীয় মানুষ জীবিকা নির্বাহের জন্য নৌকায় নির্ভর করে।
জাতীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি বছর নাইজেরিয়ার পানিপথে ১০০টিরও বেশি দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে শতাধিক মানুষ প্রাণ হারায়। সরকার পূর্বে নৌকা নিরাপত্তা বিধি কঠোর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তবে পর্যাপ্ত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় বাস্তবায়ন ধীরগতিতে চলছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও এই ধরণের মানবিক সংকটের প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সংস্থা (OCHA) নাইজেরিয়ার সরকারকে নৌকা নিরাপত্তা ও জরুরি সেবা শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে, আফ্রিকান ইউনিয়নের (AU) মানবিক সমন্বয় কেন্দ্রও এই ঘটনার পর দ্রুত সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, “নাইজেরিয়ার নদী পথে অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সমস্যার সূচক। এই ধরনের ঘটনা শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা এই সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”
অঞ্চলীয় সংস্থা ECOWAS (পশ্চিম আফ্রিকান রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক সম্প্রদায়) ইতিমধ্যে নৌকা নিরাপত্তা মানদণ্ডের পুনর্বিবেচনা ও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তথ্য শেয়ারিং বাড়ানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল অতিরিক্ত যাত্রী বহন ও পুরনো নৌকা ব্যবহার কমিয়ে দুর্ঘটনা হ্রাস করা।
নাইজেরিয়ার সরকারও এই ঘটনার পর জরুরি ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা শুরু করেছে। পরিকল্পনায় নৌকা লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া, স্থানীয় সম্প্রদায়কে সচেতনতা বৃদ্ধি করার জন্য মিডিয়া ক্যাম্পেইন চালু করা হবে, যাতে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিধি মেনে চলতে উৎসাহিত করা যায়।
দুর্ঘটনা এখনও চলমান অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে, এবং নিখোঁজ ১৪ জনের অবস্থান জানার জন্য অতিরিক্ত ড্রোন ও সোনার্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও তথ্য পাওয়া যাবে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে। এই ঘটনাটি নাইজেরিয়ার পানিপথে নিরাপত্তা ব্যবস্থার জরুরি পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা পুনরায় তুলে ধরেছে, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় নীতি সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।



