সিউলে অক্টোবর মাসে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব লাভ’ (কোরিয়ান শিরোনাম ‘জু-ইন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’) দক্ষিণ কোরিয়ার স্বতন্ত্র চলচ্চিত্র নির্মাতা ইউন গা-উন পরিচালিত একটি কাজ, যা যৌন নির্যাতনের শিকার এক কিশোরীর পরবর্তী জীবনের গল্প তুলে ধরেছে।
ইউন গা-উন আগে তেমন পরিচিত না থাকলেও, এই ছবির মাধ্যমে তিনি দেশের চলচ্চিত্র জগতে এক নতুন পরিচয় পেয়েছেন। তার নাম এখন কোরিয়ান মিডিয়ার তালিকায় ‘বছরের চলচ্চিত্র’ শিরোনামযুক্ত ছবির সঙ্গে যুক্ত।
চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র জু-ইন, ১৭ বছর বয়সী এক উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যার জীবনে স্বাভাবিকভাবে স্কুল, প্রেম, পরিবার এবং বন্ধুত্বের নানা দিক রয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, সে স্কুলে একটি পিটিশনে স্বাক্ষর না করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা তাকে একটি কঠিন সামাজিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
এই পিটিশনটি একটি ১০ বছর বয়সী শিশুর ওপর অপরাধী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল, যার ফলে জু-ইনের বন্ধুত্ব, পরিবারিক সম্পর্ক এবং নিজের আত্মমর্যাদা সবই পরীক্ষা করা হয়। ছবিটি অপরাধের দৃশ্য পুনরায় না দেখিয়ে, শিকারীর দৈনন্দিন জীবনের সূক্ষ্ম দিকগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।
চলচ্চিত্রে ‘প্যারাসাইট’ চলচ্চিত্রের জ্যাং হ্যে-জিন এবং কেড্রামার গো মিন-শি সহ বেশ কিছু পরিচিত মুখ দেখা যায়, তবে প্রধান ভূমিকায় নতুন মুখ সেও সু-বিনের অভিনয় রয়েছে, যাকে প্রথমবার বড় পর্দায় দেখা যায়।
প্রকাশের পর থেকে ছবিটি সমালোচক ও দর্শকদের কাছ থেকে উভয়ই প্রশংসা পেয়েছে। নেভারের মতো দেশের বৃহত্তম অনলাইন সার্চ প্ল্যাটফর্মে দর্শকরা ১০ এর মধ্যে ৯ পয়েন্টের উচ্চ রেটিং দিয়েছে, যা এর জনপ্রিয়তা স্পষ্ট করে।
বক্স অফিসে ছবিটি অক্টোবরের পর থেকে প্রায় এক মিলিয়ন একশো দশ হাজার ডলারের বেশি আয় করেছে, যা স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রের জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এই আর্থিক ফলাফল ছবির বিষয়বস্তুর প্রতি জনসাধারণের বাড়তে থাকা আগ্রহকে নির্দেশ করে।
বিশ্ববিখ্যাত ‘প্যারাসাইট’ চলচ্চিত্রের পরিচালক বং জুন-হোও এই ছবির প্রশংসা করে বলেছেন, এটি ‘একটি মাস্টারপিস’। তিনি নিজেকে ‘সিউল শাখার ইউন গা-উনের ফ্যান ক্লাবের প্রধান’ বলে উল্লেখ করে ছবির প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়া একটি গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, যেখানে নারীরা প্রায়শই তাদের কণ্ঠ শোনাতে সংগ্রাম করে। এই চলচ্চিত্রের সাফল্য সমাজে যৌন নির্যাতন ও শিকারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা বাড়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দর্শকরা ছবির সূক্ষ্ম বর্ণনা ও বাস্তবধর্মী চরিত্রায়ণের প্রশংসা করে, বিশেষত জু-ইনের দৈনন্দিন জীবনের চিত্রায়ণকে সত্যিকারের মানবিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সামাজিক মিডিয়ায় ছবির সম্পর্কে আলোচনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা আরও বেশি মানুষকে থিয়েটারে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছে।
ইউন গা-উন প্রকাশের পরের কয়েক সপ্তাহে প্রকাশ করেছেন যে তিনি এখনো এই সাফল্যের বাস্তবতা পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি কৃতজ্ঞতা ও কিছুটা ভয়—দুইটি মিশ্র অনুভূতি—বর্ণনা করেছেন, যা তার ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য প্রেরণা জোগাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
চলচ্চিত্রের সাফল্য কোরিয়ান চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন দৃষ্টিকোণ এনে দিয়েছে; স্বতন্ত্র নির্মাতারা এখন বড় স্ক্রিনে সামাজিক সমস্যাগুলোকে সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করার সুযোগ পেয়েছে। এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বেশি সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে কাজের উত্থান ঘটাতে পারে।
‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব লাভ’ কেবল বাণিজ্যিক সাফল্যই নয়, বরং সমাজে যৌন নির্যাতনের শিকারদের মুখোমুখি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলোকে আলোতে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সহানুভূতি ও সমর্থনের বোধ জাগ্রত হচ্ছে।
চলচ্চিত্রটি বর্তমানে সিউলের বেশ কয়েকটি প্রধান থিয়েটারে চলমান, এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর পরবর্তী রিলিজ পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি কোরিয়ার স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
সারসংক্ষেপে, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব লাভ’ একটি স্বতন্ত্র, গভীর এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মিত কাজ, যা কোরিয়ার চলচ্চিত্র শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং সমাজে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করেছে।



