ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন ৪ জানুয়ারি ডেনিশ সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য অধিগ্রহণের বিষয়ে করা হুমকি বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধিকার নেই ডেনমার্কের তিনটি অংশের—ডেনমার্ক, ফারো এবং গ্রিনল্যান্ড—কোনোটিকেই সংযুক্ত করার। এই মন্তব্যের পেছনে ট্রাম্পের সহকারী স্টিফেন মিলারের স্ত্রীর টুইটের প্রতিক্রিয়া রয়েছে, যেখানে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রকে আমেরিকান পতাকার রঙে রঙিন করে “SOON” শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল।
ফ্রেডেরিকসেনের বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ডের ওপর কোনো দাবি যুক্তিযুক্ত নয় এবং ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষা করা আন্তর্জাতিক নীতির অংশ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি লক্ষ্য করে বলেন, “ইতিহাসগতভাবে ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং স্বতন্ত্র জনগণকে বিক্রি করা যায় না”। এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি ডেনমার্কের ন্যাটো সদস্যপদ এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি তুলে ধরেছেন, যা গ্রিনল্যান্ডকে সরাসরি সুরক্ষার আওতায় রাখে।
ট্রাম্পের সহকারী স্টিফেন মিলারের স্ত্রীর টুইটটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। টুইটে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্রকে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার রঙে রঙিন করে “SOON” শব্দটি যুক্ত করা হয়েছিল, যা ডেনমার্কের সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছিল। এই পোস্টের পর ডেনিশ দূতাবাস যুক্তরাষ্ট্রে একটি স্মারক বার্তা পাঠায়, যেখানে দুই দেশের মিত্রতা উল্লেখ করে ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান দাবি করা হয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্বে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কথা উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য অধিগ্রহণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি একাধিকবার এই দ্বীপের সম্পদ, বিশেষ করে বিরল ধাতু ও তেল-গ্যাসের সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলে এর গুরুত্ব উল্লেখ করেছেন। তবে ফ্রেডেরিকসেনের মতে, এমন কোনো দাবি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রহণযোগ্য।
ডেনমার্ক ন্যাটো সদস্য হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে নিরাপত্তা গ্যারান্টির আওতায় রাখে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডে নির্দিষ্ট সামরিক সুবিধা প্রদান করে। ফ্রেডেরিকসেন উল্লেখ করেন যে, ডেনমার্ক ইতিমধ্যে আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা বিনিয়োগ বাড়িয়ে তুলেছে এবং এই বিনিয়োগের মাধ্যমে দ্বীপের স্বায়ত্তশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ডেনিশ দূতাবাসের যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো স্মারক বার্তায় বলা হয় যে, দুই দেশ দীর্ঘদিনের মিত্র এবং ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা উচিত। এই বার্তাটি ট্রাম্পের সহকারী স্টিফেন মিলারের স্ত্রীর টুইটের পরপরই প্রকাশিত হয় এবং ডেনমার্কের সরকারী অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
এই ঘটনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় একটি বড় সামরিক অভিযান চালায়, যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আদেশে দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়। এই অপারেশনটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনার বিষয় হয় এবং ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে।
ভেনেজুয়েলা অভিযানের পর ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেন এবং দেশকে “চালিয়ে যাবে” বলে ঘোষণা করেন। এই মন্তব্যগুলো ডেনমার্কের ফ্রেডেরিকসেনের সতর্কবার্তার সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে, যেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ডের ওপর হুমকি বন্ধ করতে আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন যে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ডের ওপর ধারাবাহিক আগ্রহ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিলতা বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর মধ্যে। ডেনমার্কের স্পষ্ট অবস্থান এবং ন্যাটো গ্যারান্টি ভবিষ্যতে কোনো সম্ভাব্য ভূখণ্ডিক বিরোধকে রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে, যুক্তরাষ্ট্রের আর্কটিক কৌশল এবং সম্পদ অনুসন্ধানের ইচ্ছা ভবিষ্যতে নতুন কূটনৈতিক আলোচনার সূচনা করতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেনের বিবৃতি ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত হুমকিগুলোর প্রতি স্পষ্ট বিরোধ প্রকাশ করে এবং ডেনমার্কের ভূখণ্ডিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক গ্যারান্টি ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির গুরুত্বকে পুনর্ব্যক্ত করে। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি ন্যাটো ও আর্কটিক নিরাপত্তা নীতিতে কীভাবে প্রভাব ফেলবে তা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে থাকবে।



