যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা উপর সামরিক হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্তের পর, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তীব্র সমালোচনা দেখা দিয়েছে। সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, ডেমোক্র্যাট নেত্রী কামালা হ্যারিস, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিরা এই পদক্ষেপকে অবৈধ ও বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের এই আক্রমণ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর শাসনকে উখরে ফেলতে চাওয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানিক সীমা অনুযায়ী বিদেশে একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের কোনো অনুমোদন নেই।
সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স রোববার সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের পদক্ষেপকে “বৈধতা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি যুক্তি দেন যে, ট্রাম্পের এই কাজটি তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি “আমেরিকা সর্বাগ্রে”-এর সঙ্গে বিরোধপূর্ণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ না দিয়ে বিদেশে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান চালানো অনুচিত। স্যান্ডার্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কোনো একতরফা ক্ষমতা নেই অন্য দেশের শাসনকে উখরে ফেলতে, এমনকি মাদুরোর মতো এক দুর্নীতিবাজ শাসককে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ারও তার কোনো অধিকার নেই।
স্যান্ডার্সের মতে, এই ধরনের অবৈধ সামরিক হস্তক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি হবে। তিনি কংগ্রেসকে দ্রুত যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রস্তাব পাস করার আহ্বান জানান, যাতে ভবিষ্যতে অনধিকারিক সামরিক অভিযান রোধ করা যায়। স্যান্ডার্সের এই দাবি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সামরিক ক্ষমতার সীমা ও কংগ্রেসের তত্ত্বাবধানের গুরুত্বকে পুনরায় উন্মোচিত করেছে।
ডেমোক্র্যাট পার্টির নেত্রী কামালা হ্যারিসও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে “বৈধতা ও আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি লঙ্ঘন” বলে নিন্দা করেন। হ্যারিস উল্লেখ করেন, ভেনেজুয়েলার বর্তমান শাসনকে স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর এবং অবৈধ বলা সত্ত্বেও ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের কোনো ন্যায়সঙ্গত যুক্তি নেই। তিনি যুক্তি দেন, ট্রাম্পের এই আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত বা শক্তিশালী করবে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করবে। হ্যারিসের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, বিদেশি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধি করা কোনো কৌশলই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টও ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শক্তি বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক শৃঙ্খলা ও শান্তিকে ক্ষুণ্ন করবে। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের মতে, মাদুরোর শাসনকে উখরে ফেলতে ট্রাম্পের যুক্তি কোনো বৈধতা পায় না এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের বিরোধী। তার মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি হল আইনগত প্রক্রিয়া ও বহুপাক্ষিক সমঝোতা, একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপ নয়।
নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি ট্রাম্পের পদক্ষেপকে “ভেনেজুয়েলা বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা” হিসেবে বর্ণনা করে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন। মেয়র উল্লেখ করেন, এই ধরনের আক্রমণ কেবল ভেনেজুয়েলার জনগণকে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, বিদেশে অবৈধ সামরিক অভিযান চালিয়ে নয়। মেয়রের মন্তব্যে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব ও নিরাপত্তা উদ্বেগের ইঙ্গিত রয়েছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পর, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও নাগরিক সমাজের মধ্যে তীব্র বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাট ও কিছু স্বাধীন সেনেটর ট্রাম্পের ক্ষমতা ব্যবহারকে সীমিত করার দাবি জানিয়ে কংগ্রেসে সংশ্লিষ্ট আইন প্রণয়নের পক্ষে সই করছেন। অন্যদিকে, কিছু রক্ষণশীল গোষ্ঠী যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য শক্তিশালী পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে, যদিও তারা ট্রাম্পের একতরফা হস্তক্ষেপকে সমর্থন করেন না।
এই বিতর্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিদেশ নীতি ও কংগ্রেসের যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত আলোচনায় নতুন মোড় আসতে পারে। যদি কংগ্রেস স্যান্ডার্সের প্রস্তাবিত যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত আইন পাস করে, তবে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত হবে। অন্যদিকে, যদি আইনগত বাধা না থাকে, তবে ট্রাম্পের মতো নেতারা আবারো অনধিকারিকভাবে বিদেশে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা বজায় রাখতে পারেন।
অন্তত এখন পর্যন্ত, ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে কঠোর নিন্দা পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে লাতিন আমেরিকায় তার অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। ভবিষ্যতে কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত এবং প্রেসিডেন্টের নীতি পরিবর্তনই নির্ধারণ করবে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের সীমা কোথায় নির্ধারিত হবে।



