যুক্তরাষ্ট্রের একশের বেশি বছর ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রভাব বিস্তারের অন্যতম প্রধান উপায় হল বিদেশি সরকার পরিবর্তন, অর্থাৎ রেজিম চেঞ্জ। গ্লোবাল গবেষণার ভিত্তিতে ১৮১৬ থেকে ২০১১ পর্যন্ত প্রায় ১২০ বার বিদেশি হস্তক্ষেপে কোনো সরকার পতিত হয়েছে, যার মধ্যে এক তৃতীয়াংশের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আটককে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয়ষ্ঠত্রি হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
গবেষক আলেকজান্ডার ডাউনস, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, তার “ক্যাটাস্ট্রফিক সাকসেস হোয়াই ফরেন ইমপোজড রেজিম চেঞ্জ গোজ রং” গ্রন্থে এই তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে প্রায় বিশটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের রেকর্ড রয়েছে। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক চাপে যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক দেশে শাসন পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা ও সহিংসতা দেখা দিয়েছে।
ইরাক ও আফগানিস্তান রেজিম চেঞ্জ নীতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত। ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের পতনের পর জর্জ ডব্লিউ. বুশ প্রশাসন মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে সাদ্দামের পতনের তিন বছর পর, ২০০৬ সালে ইরাকে ব্যাপক সহিংসতা ও সেক্টরিয়াল সংঘাতের শিখা জ্বলে উঠেছিল। শূন্যতা তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্নি-শিয়া গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তপাত বাড়ে, যা পরবর্তীতে আইএসের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। আজও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ইরাকে অব্যাহত রয়েছে।
আফগানিস্তানে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই দশকের যুদ্ধের পর ২০২১ সালে ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ত্যাগের পর তৎক্ষণাৎ তালেবান শাসন গ্রহণ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যকে ব্যর্থ করে। উভয় ক্ষেত্রে দেখা যায়, শাসন পরিবর্তনের পর স্বল্পমেয়াদে শাসন কাঠামো বদললেও স্থায়ী শান্তি ও গণতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে যায়।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে, নিকোলাস মাদুরোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও আইনি পদক্ষেপকে রেজিম চেঞ্জের একটি নতুন পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও মাদুরো এখনও ক্ষমতায় আছেন, তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে তার বৈধতা নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে। এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বজায় রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, রেজিম চেঞ্জ নীতির দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল প্রায়শই অস্থিরতা, মানবিক সংকট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা হুমকির রূপ নেয়। লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্দা ও সামাজিক অশান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় শাসন পরিবর্তনের পর সেক্টরিয়াল সংঘাতের ঝড় তীব্র হয়েছে।
ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের রেজিম চেঞ্জ নীতি পুনর্বিবেচনা করা হবে কিনা, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গতি-প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। যদি যুক্তরাষ্ট্র স্বল্পমেয়াদী কৌশলকে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে হস্তক্ষেপের রূপ ও পরিসরে পরিবর্তন আসতে পারে। অন্যদিকে, যদি হস্তক্ষেপের ফলে সৃষ্ট অস্থিরতা অব্যাহত থাকে, তবে আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও আঞ্চলিক বিরোধ বাড়তে পারে।
সারসংক্ষেপে, যুক্তরাষ্ট্রের একশের বেশি বছরের রেজিম চেঞ্জ নীতি প্রায় ১২০ বার সরকার পতনে ভূমিকা রেখেছে, যার এক তৃতীয়াংশের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। ইরাক, আফগানিস্তান ও ভেনেজুয়েলা সহ বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপের পর দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা, সেক্টরিয়াল সংঘাত ও মানবিক সংকট দেখা গেছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ উত্থাপন করছে, যা ভবিষ্যতে নীতি নির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।



