ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে রবিবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ জানিয়েছেন, জুলাই ২০২৪-এ ছাত্র‑জনতা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থানা‑অফিসার (ওসি) ও সুপার (এসপি) সহ উচ্চতর কমান্ডিং কর্মকর্তাদের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে সেই থানা‑অফিসারদের নাম, যাদের অধীনে জুলাই উত্থানে ছাত্র‑জনতা নিহত হয়; ওসি‑এসপি থেকে শুরু করে জেলা‑পুলিশ সুপার এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নামও এতে থাকবে।
তৈরি করা তালিকাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে, এটাই আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
জুলাই ২০২৪-এ কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া প্রতিবাদকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চরম দমন‑পীড়নের মুখে ফেলেছিল; রক্তাক্ত রাস্তায় রূপান্তরিত হয়ে তা শেষ পর্যন্ত উত্থানে পরিণত হয়।
উত্থানের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতের আশ্রয় নেয়, এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়, যাতে উক্ত সময়কালে আওয়ামী লীগ শাসনের অধীনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ব্যবস্থা করা যায়।
এই ট্রাইব্যুনালের এক মামলায় শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে; তদুপরি, তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল‑মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড আরোপ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে রিফাত রশিদ আন্দোলনের তিনটি মূল দাবি ও দুটি কর্মসূচি উপস্থাপন করেন।
প্রথম দাবি হল, হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসানকে শুধুমাত্র জামিন নয়, সম্পূর্ণ মুক্তি প্রদান করা এবং শায়েস্তাগঞ্জ থানা-ওসিকে পদত্যাগে বাধ্য করা।
দ্বিতীয় দাবি অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত জুলাই উত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র‑শ্রমিক‑জনতার সকল কর্মকাণ্ডের জন্য দায়মুক্তি প্রদান করা এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হবে।
তৃতীয় দাবি হল, জুলাই বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সামরিক, নৌ, বিমানবাহিনীসহ আধা‑সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সকল কর্মকর্তা, সৈনিক ও কর্মচারীদের দায়িত্বমুক্তি নিশ্চিত করা।
দুইটি কর্মসূচি হিসেবে আন্দোলন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট আইনি নথি দ্রুত সম্পন্ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের দমন‑পীড়নের দায়িত্বশীলদের আন্তর্জাতিক স্তরে জবাবদিহি করাতে চায়।
অধিকন্তু, আন্দোলন দাবি করে যে, সরকারকে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে উক্ত অপরাধের শিকারের পরিবারকে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এই দাবিগুলি সরকারকে আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার সংস্থার সামনে দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনের পর থেকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে ত্বরান্বিত করার জন্য সরকারী পক্ষের কোনো স্পষ্ট মন্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
তবে, সরকারী সূত্র থেকে জানানো হয়েছে যে, উক্ত মামলাগুলোর ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য শাস্তি সম্পর্কে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এই উদ্যোগের ফলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যারা তৎকালীন উত্থানের সময় সরকারী নীতি সমর্থন করেছিল।
অপরদিকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরও এই মামলায় কেন্দ্রীভূত হতে পারে, কারণ এটি দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি সংবেদনশীল বিষয়কে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার প্রচেষ্টা।
আসন্ন সপ্তাহে আন্দোলন তালিকাভুক্ত কর্মকর্তাদের নামের চূড়ান্ত রূপ প্রকাশের পরিকল্পনা করছে এবং তা সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দাখিলের প্রস্তুতি নেবে।
এই প্রক্রিয়ার ফলাফল দেশের আইনি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন উল্লেখ করেছে যে, যদি সরকার তাদের দাবিগুলো মেনে না নেয়, তবে তারা অতিরিক্ত আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা রাখে।
সামগ্রিকভাবে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের দায়িত্বশীলদের আন্তর্জাতিক আদালতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে।



