বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম তিন দিনে দেশে রেমিট্যান্সের মোট প্রবাহ ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৮.৮ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। এই পরিমাণ দেশের আর্থিক ইতিহাসে সর্বোচ্চের কাছাকাছি এবং চলতি অর্থবছরের মোট রেমিট্যান্সের ৯৫ শতাংশেরও বেশি প্রতিনিধিত্ব করে।
একই সময়সীমায় গত বছর মাত্র ২১ কোটি ডলার রেমিট্যান্স রেকর্ড করা হয়েছিল, যা এই বছরের প্রবাহের তুলনায় প্রায় ৩৭ শতাংশ কম। এই তীব্র বৃদ্ধি বিদেশি শ্রমিকদের আয় বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে সরবরাহের ত্বরান্বিত প্রবাহের সূচক।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেমিট্যান্সের সর্বোচ্চ মাসিক রেকর্ড মার্চে গড়ে তোলা হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে মে মাসে সর্বোচ্চ ২৯৭ কোটি ডলার (প্রায় ২৯.৭ বিলিয়ন ডলার) রেকর্ড করা হয়। এই দুই মাসের উচ্চ প্রবাহের পর, জানুয়ারির প্রথম তিন দিনেই রেকর্ডের কাছাকাছি একটি সংখ্যা দেখা গেছে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।
অতীত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানও এই প্রবণতাকে সমর্থন করে। নভেম্বর ২০২৩-এ রেমিট্যান্স ছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার, অক্টোবরের সংখ্যা ২৫৬ কোটি ৩৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার, এবং সেপ্টেম্বরের প্রবাহ ২৬৮ কোটি ৫৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আগস্ট ও জুলাই মাসে যথাক্রমে ২৪২ কোটি ১৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার এবং ২৪৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার রেমিট্যান্স রেকর্ড করা হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে রেমিট্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী গতি সাময়িক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা।
বৃহৎ পরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ দেশের মুদ্রা রিজার্ভে সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিজার্ভের বৃদ্ধি ডলার-টাকার রেটকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে, ফলে আমদানি খরচের অস্থিরতা কমে এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপ হ্রাস পায়। এছাড়া, রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাড়ি, গাড়ি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী করে।
বাজারের দৃষ্টিকোণ থেকে, রেমিট্যান্সের প্রবাহ ছোট ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের জন্য মূলধন সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বহু পরিবার রেমিট্যান্সের মাধ্যমে ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণ করে, ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অবদান রাখে। রিয়েল এস্টেট বাজারেও রেমিট্যান্সের মাধ্যমে বাড়ি কেনা বা নির্মাণের চাহিদা বাড়ে, যা সম্পত্তি মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
তবে রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কিছু ঝুঁকি বহন করে। গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থান নীতি পরিবর্তন বা রেমিট্যান্সের উপর ট্যাক্স বাড়লে প্রবাহে হ্রাস ঘটতে পারে। এছাড়া, মুদ্রা রূপান্তরের সময় বিনিময় হারের ওঠানামা রেমিট্যান্সের প্রকৃত মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা গ্রাহকদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ দৃষ্টিতে, রেমিট্যান্সের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বজায় রাখতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ডিজিটাল পেমেন্ট সিস্টেমের উন্নয়ন, রেমিট্যান্সের খরচ কমানো এবং নিরাপদ লেনদেনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে, কর্মসংস্থান বৈচিত্র্যকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে বিদেশি শ্রমিকদের আয় বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিমালা রেমিট্যান্সের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে।
সংক্ষেপে, জানুয়ারির প্রথম তিন দিনে রেকর্ডভিত্তিক রেমিট্যান্স প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে, ভোক্তা ব্যয় ও বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবাহকে স্থিতিশীল রাখতে নীতি সমর্থন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।



