৪ জানুয়ারি রবিবার, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রথম ই‑জাস্টিস হলে নতুন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর স্বাগত অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ বিচার ব্যবস্থার সব স্তরে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি নির্মূলের জরুরি আহ্বান জানালেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অর্থনৈতিক দুর্নীতির তুলনায় বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও ক্ষয়কারী ও মৃত্যুকারী, যা দেশের আইনি কাঠামোর স্বাস্থ্যের জন্য ক্যানসারের চেয়েও হুমকি।
অভিযোগের মূল বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, দুর্নীতি এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের মতো, যা আদালতের কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতাকে ক্ষুণ্ন করে। রউফের মতে, জাতি প্রত্যাশা করে যে, বিচার বিভাগ সম্পূর্ণভাবে সিংডিকেট ও দুর্নীতিমুক্ত হবে, এবং এ লক্ষ্যে উচ্চ ও নিম্ন আদালতের সকল কর্মীকে সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে হবে।
বক্তব্যের সময় তিনি অতীতের ১৫ বছরকে স্মরণ করে বলেন, সেই সময়ে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক দলবদ্ধতা ও দুর্বৃত্তায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও অবিচার প্রবল ছিল। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর থেকে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে এবং স্বাধীন, সার্বভৌম বিচার ব্যবস্থা নতুন বাংলাদেশের গঠনকে সমর্থনকারী প্রথম সিঁড়ি হিসেবে কাজ করবে, এ কথা তিনি জোর দিয়ে বলেন।
রউফ বর্তমান মামলার পরিমাণের দিকে ইঙ্গিত করে জানান, আপিল বিভাগে বর্তমানে ৩৯,৪১৭টি এবং হাইকোর্ট বিভাগে ৬,৩৭,৮৮২টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তিনি জোর দেন যে, মামলার জট কমাতে গিয়ে ন্যায়বিচারের মান হ্রাস না হওয়া নিশ্চিত করা দরকার, তাই দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুণগত মান বজায় রাখার জন্য সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
বিচারিক সম্প্রদায়ের কিছু বিশ্লেষক রউফের শুদ্ধি অভিযানের প্রতি ইতিবাচক সাড়া পেয়েছেন, তবে একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন যে, মামলার পরিমাণ হ্রাসের জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নিলে বিচারিক প্রক্রিয়ার গুণগত মানে ক্ষতি হতে পারে। তাই তারা সুপারিশ করেন যে, কেস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রেকর্ডিং এবং পর্যবেক্ষণ কমিটি গঠন করা উচিত, যাতে দ্রুত ন্যায়বিচার এবং গুণগত মান দুটোই সমন্বিতভাবে অর্জন করা যায়।
অ্যাটর্নি জেনারেল রউফের এই আহ্বান সরকারী ও বিচারিক নীতি নির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শুদ্ধি অভিযান যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের আইনি শাসনের প্রতি জনসাধারণের আস্থা বাড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচনী ও নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, যদি ব্যাকলগ কমাতে অতিরিক্ত ত্বরান্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তা ন্যায়বিচারের গুণগত মানে হ্রাস ঘটিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী গোষ্ঠীর সমালোচনার মুখে পড়তে পারে।
রউফের বক্তব্যের পর, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে শুদ্ধি অভিযানের সফলতা কামনা করে একটি সংক্ষিপ্ত সমাপনী মন্তব্য করেন। তারা উল্লেখ করেন যে, বিচারিক সংস্কার ও দুর্নীতি মোকাবিলার জন্য সকল স্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন, এবং এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিচারিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
শুধু শুদ্ধি অভিযানই নয়, রউফ ভবিষ্যতে বিচারিক প্রশিক্ষণ, নৈতিকতা কোর্স এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নতুন নীতি প্রণয়নের পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচারিক কর্মীদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি কমে যাবে এবং দেশের আইনি কাঠামো আরও শক্তিশালী হবে।
বিচার বিভাগের এই নতুন দিকনির্দেশনা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সূচিত করতে পারে, বিশেষ করে যখন নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশীয় ন্যায়বিচারের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করছে। রউফের শুদ্ধি অভিযান যদি সফল হয়, তবে তা দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।



