৪ জানুয়ারি রবিবার কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা শিবিরে মিয়ানমার স্বাধীনতা দিবসের ৭৮তম বার্ষিকী উদযাপন করা হয়। শিবিরের দুইটি প্রধান এলাকায় (ক্যাম্প‑১ পশ্চিম ও ক্যাম্প‑৯) বিভিন্ন বয়সের শরণার্থী একত্রিত হয়ে অনুষ্ঠান ও সমাবেশে অংশ নেন। এই উপলক্ষ্যে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অগ্রগতির অভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
ক্যাম্প‑১ (পশ্চিম) তে “ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা” (ইউসিআর) আয়োজিত সমাবেশে মিয়ানমার জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় এবং রোহিঙ্গা জনগণের ইতিহাস ও রাষ্ট্রহীনতার সমস্যার ওপর আলোচনা হয়। সমাবেশে উপস্থিতদের মধ্যে তরুণ ও বৃদ্ধ উভয়ই শোনেন যে, স্বাধীনতা অর্জনের পরও তাদের নাগরিকত্ব স্বীকৃত হয়নি, ফলে ঘরে ফেরার অধিকার থেকে বঞ্চিত।
ইউসিআরের সভাপতি মাস্টার সৈয়দউল্লাহ সমাবেশে বলেন, “মিয়ানমার স্বাধীনতা আমাদের জন্য কোনো বাস্তব স্বার্থ নিয়ে আসেনি; আমাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং আমরা এখনও রাষ্ট্রহীন।” তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান যে, দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তার মন্তব্যে দেখা যায় যে, শিবিরের শরণার্থীরা কাগজে থাকা চুক্তি ও পরিকল্পনা ছাড়া বাস্তব পদক্ষেপের অপেক্ষায়।
অন্যদিকে ক্যাম্প‑৯ তে “রোহিঙ্গা কমিটি ফর পিস অ্যান্ড রিপেট্রিয়েশন” (RCPR) এর সভাপতি দিল মোহাম্মদ সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে, না হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অচল থাকবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সক্রিয় ভূমিকা এবং জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করেন।
মাওলানা আব্দুর রহিম, শিবিরের ধর্মীয় নেতা, বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, “বাংলাদেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, তবে এই মানবিক সংকটের সমাধান একক দেশেই সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক সমাজের সমন্বিত দায়িত্ব ছাড়া পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠবে।” তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপত্তা ও মানবিক অধিকার রক্ষায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, মিয়ানমার ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন করলেও রোহিঙ্গা জনগণকে নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন তাদের অধিকারের স্বীকৃতি সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে, ফলে তারা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গৃহযুদ্ধ ও গণহত্যা পরবর্তী সময়ে এই সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং শিবিরে শরণার্থীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সম্প্রতি রোহিঙ্গা শরণার্থীর নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মানবাধিকার প্রতিনিধি মিয়ানমারকে জাতিসংঘের রোহিঙ্গা বিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা ম্যান্ডেট বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন। এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ শিবিরের শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে পারে।
আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে কিছু সদস্য রাষ্ট্র রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক সাহায্য প্রদান করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে মিয়ানমার সরকার এখনও স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেনি, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও রোহিঙ্গা শিবিরের নিরাপত্তা ও মানবিক অবস্থার উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোর কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। মন্ত্রীর একটি বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, শিবিরের শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান না হলে দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেন, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার দেরি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিবিরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে মানবিক সহায়তার চাহিদা বাড়বে, পাশাপাশি সীমান্তে অবৈধ স্রোত ও অপরাধমূলক কার্যকলাপের ঝুঁকি বাড়বে। তাই শীঘ্রই একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠন করা জরুরি, যাতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছাসেবী প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা যায়।
পরবর্তী কয়েক মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ ও আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান নিয়ে বিশেষ সেশন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই সেশনগুলোতে মিয়ানমার সরকারকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে বলা হতে পারে, যা রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিবিরের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলোই একমাত্র আশার আলো হিসেবে দেখা যাচ্ছে।



