লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রাম, সূতারগোপ্টা এলাকায় ১৯ ডিসেম্বর রাত ১০টার পর ঘরে অগ্নিকাণ্ডে ৭ বছর বয়সী আয়েশা আক্তার প্রাণ হারিয়ে। একই রাতে তার বাবা বেলাল হোসেন, স্ত্রী নাজমা বেগম, দুই সন্তান ও দুই মেয়ে তৎক্ষণাৎ নিরাপদে বের হতে পারেন, তবে ছোট্ট মেয়ের শ্বাস‑নালিতে আগুনের তীব্রতা পৌঁছায় এবং সে পুড়ে মারা যায়।
বেলাল হোসেনের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের সূত্র অনুসারে, কেউ দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। অগ্নি দ্রুত ছড়িয়ে বাড়ির টিনের কাঠামোকে ধ্বংস করে, ফলে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা পরিবার সদস্যদের জন্য পালানোর পথ সংকীর্ণ হয়ে যায়। বেলাল হোসেন ও তার স্ত্রী নাজমা বেগম, বড় মেয়ে সালমা আক্তার ও মাঝারি মেয়ে সামিয়া আক্তারকে টিনের ছাদ উঁচু করে বের করতে সক্ষম হন, তবে ছোট্ট আয়েশার কণ্ঠে ডাকার পরেও আগুনের তীব্রতায় পৌঁছাতে পারেন না।
বেলাল হোসেন, যিনি ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের বিএনপি সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সূতারগোপ্টা বাজারে সারের দোকান চালান, অগ্নিকাণ্ডের পর ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, “মেয়ের রেজাল্ট হয়েছে, ভালো করছে, সেকেন্ড হয়েছে। কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়ে আর কী হবে?” তিনি ফলাফল প্রকাশের পরেও শোকের মধ্যে আছেন, কারণ তার ছোট্ট মেয়ে আরেকটি রেজাল্টের বদলে প্রাণ হারিয়েছে।
আয়েশার রোল নম্বর ২২, বার্ষিক পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় পরিবারে আনন্দের মুখের ছবি দেখা যেত। তবে ফলাফল প্রকাশের পরপরই অগ্নিকাণ্ড ঘটায়, ফলে সেই আনন্দের মুহূর্ত কেবল নীরব শোকের বার্তায় রূপান্তরিত হয়।
অগ্নিকাণ্ডের পরপরই বড় মেয়ে সালমা আক্তারও দাহজনিত আঘাতের শিকার হন। ২৫ ডিসেম্বর রাতে, ঢাকা শহরের জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তার চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তার শ্বাসনালিসহ দেহের প্রায় ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল, ফলে শ্বাসযন্ত্রে গুরুতর ক্ষতি হয়। একই দিনে তার শ্বাসযন্ত্রের ক্ষতির কারণে শ্বাসরোধ ঘটায় এবং তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সালমা ৫ ডিসেম্বর ফোনের মাধ্যমে বিদেশে বসবাসকারী পাত্রের সঙ্গে বিয়ে করেন। তার বিয়ের পরপরই দাহজনিত আঘাতের ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর, তার অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘটে।
বেলাল হোসেনের তিনটি সন্তান – আয়েশা (৭), সালমা (বয়স অজানা), সামিয়া (বয়স অজানা) – এবং দুইটি ছেলে – নাজমুল ইসলাম (৪ বছর) ও নজরুল ইসলাম (৪ মাস) – এই দু’টি দুঃখজনক ঘটনার শিকার হয়েছে। বেলাল হোসেন ও নাজমা বেগম বাকি সন্তানদেরকে টিনের ছাদে তুলে নিরাপদে বের করতে সক্ষম হন, তবে ছোট্ট আয়েশার জন্য তা যথেষ্ট হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের জন্য স্থানীয় পুলিশ ও দমকল বিভাগ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। প্রাথমিক তদন্তে জানানো হয়েছে যে, দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালানো হয়, তবে দায়ী ব্যক্তির পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই দু’টি দুঃখজনক ঘটনা স্থানীয় সমাজে শোকের ছায়া ফেলেছে। পরিবার ও প্রতিবেশীরা শোক প্রকাশের পাশাপাশি, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করছেন।
বেলাল হোসেনের পরিবারে এখনো শোকের ছায়া বিরাজমান, যেখানে একদিকে তিনি সন্তানদের শিক্ষাগত সাফল্য নিয়ে গর্ব প্রকাশ করছিলেন, অন্যদিকে দু’টি সন্তানই আগুনের শিকারে প্রাণ হারিয়েছেন। এই ট্র্যাজেডি স্থানীয় সমাজে নিরাপত্তা, দায়িত্ব এবং অপরাধমূলক ঘটনার প্রতিরোধের গুরুত্বকে পুনরায় তুলে ধরেছে।



