ঢাকা—মোবাইল ব্যবসা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে রোববার (৪ জানুয়ারি) বৈঠকের পর রমনা বিভাগের উপ‑পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম জানিয়েছেন, আগামী ৯০ দিন কোনো মোবাইল ফোন নেটওয়ার্কে ব্ল্যাকলিস্ট করা হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, লঞ্চের পূর্বে বাজারে থাকা সব স্টক লট বৈধ থাকবে এবং বিক্রেতাদের জন্য কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হবে না।
বৈঠকে আলোচনার অংশ হিসেবে, উৎপাদনকারীরা ডিস্ট্রিবিউটরদের অতিরিক্ত ৩ থেকে ৪ শতাংশ ছাড় প্রদান করবে। এই ছাড়ের মাধ্যমে বিক্রেতারা শোরুমের মূল্যের চেয়ে কম দামে ফোন বিক্রি করতে সক্ষম হবেন, যা শেষ ব্যবহারকারীর জন্য দাম কমাতে সহায়তা করবে।
এই ঘোষণার পূর্বে, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে এনইআইআর (নতুন ইম্পোর্টেড আইডেন্টিফিকেশন রেজিস্ট্রি) সিস্টেমের লঞ্চের ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক প্রতিবাদের ফলে, বিটিআরসির সিদ্ধান্তে লঞ্চের তারিখ ১৫ দিন পিছিয়ে ১ জানুয়ারি নির্ধারিত হয়।
১ জানুয়ারি, রাজধানীর আগারগাঁওতে বিটিআরসি কার্যালয়ের সামনে মোবাইল ব্যবসায়ীদের একটি গোষ্ঠী প্রতিবাদে সমবেত হয়। কিছু অংশগ্রহণকারী ইট‑পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং অফিসের জানালায় আঘাত হানে, ফলে সাময়িক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শীঘ্রই নিয়ন্ত্রণে আসে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিটিআরসি জানিয়েছে, এনইআইআর সিস্টেম চালু হলে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত ও বৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটই নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকতে পারবে। সিস্টেমটি অবৈধভাবে দেশে আনা ফোনের ব্যবহার বন্ধ করবে এবং পুরনো, ক্লোনড, ব্যবহারিক ফোনের বাণিজ্যেও বাধা দেবে। তবে সিস্টেমের কার্যকর হওয়ার আগে, বর্তমানে নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত কোনো ফোন বন্ধ করা হবে না।
সরকারের মতে, কিছু ব্যবসায়ী অবৈধ পথে কর ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের, ক্লোনড বা পুরনো ফোন বাজারে নিয়ে আসছে। এই অনিয়ম রোধের জন্য হ্যান্ডসেট নিবন্ধনে এনইআইআর চালু করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য অনুসারে, সিস্টেমের মাধ্যমে প্রতিটি ফোনের IMEI নম্বর যাচাই করা হবে এবং অনুমোদিত না হলে নেটওয়ার্কে সংযোগ অস্বীকার করা হবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন, এনইআইআর সিস্টেমের সফল বাস্তবায়ন মোবাইল বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করবে এবং গ্রাহকদের নকল বা নিম্নমানের ডিভাইস থেকে রক্ষা করবে। এছাড়া, সরকারী রাজস্ব বাড়বে এবং বৈধ উৎপাদন ও বিক্রয় চেইনকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
বাজারের বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, ডিসকাউন্টের ফলে শোরুমের মূল্যের তুলনায় ফোনের বিক্রয়মূল্য প্রায় ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাবে। এটি বিশেষত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক হবে, কারণ তারা এখন আরও সাশ্রয়ী দামে স্মার্টফোন পেতে পারবে।
এছাড়া, তিন মাসের ব্ল্যাকলিস্ট স্থগিতের ফলে ব্যবসায়ীরা তাদের বিদ্যমান স্টক বিক্রি চালিয়ে যেতে পারবে, যা সরবরাহ শৃঙ্খলকে স্থিতিশীল রাখবে। এই সময়ে উৎপাদনকারীরা বাজারের চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন বাড়াতে পারে, ফলে ভবিষ্যতে ফোনের ঘাটতি বা অতিরিক্ত স্টক সমস্যার সম্ভাবনা কমে যাবে।
বিটিআরসি এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল লক্ষ্য হিসেবে দেশের টেলিকম অবকাঠামোকে নিরাপদ ও স্বচ্ছ রাখা উল্লেখ করেছে। এনইআইআর সিস্টেমের মাধ্যমে নেটওয়ার্কে সংযুক্ত ডিভাইসের সঠিক রেকর্ড রাখা সম্ভব হবে, যা সাইবার নিরাপত্তা ও ব্যবহারকারী সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে, ডিসি মাসুদ আলমের ঘোষণায় দেখা যায়, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবসায়িক স্বার্থ ও গ্রাহক সুরক্ষার মধ্যে সমতা রক্ষা করার চেষ্টা করছে। তিন মাসের সময়সীমা শেষ হলে এনইআইআর সিস্টেমের পূর্ণ কার্যকারিতা শুরু হবে, যা দেশের মোবাইল ইকোসিস্টেমকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করে তুলবে।



