বাংলাদেশের সর্বশেষ এলডিসি (কম উন্নত দেশ) গ্র্যাজুয়েশন সময়সীমা নভেম্বর ২০২৬, আর এখনো দেশের ব্যবসা ক্ষেত্র থেকে প্রস্তুতির অভাবের ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ পাচ্ছে। সরকারী সময়সূচি অনুসারে দেশটি ১১ মাসের মধ্যে এলডিসি ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসবে, তবে রপ্তানির ওপর প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও শিল্প নেতারা সতর্কতা দিচ্ছেন।
অস্থায়ী সরকার গ্র্যাজুয়েশনকে নভেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (UNCDP)কে আহ্বান জানিয়েছে। এই কমিটি গত বছর নভেম্বর প্রথম মূল্যায়ন পরিচালনা করে ব্যবসা, নীতি নির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতামত সংগ্রহ করেছিল।
UNCDP-র দ্বিতীয় রাউন্ড মূল্যায়ন ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারিত হয়েছে, যা একই সময়ে দেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনেরও সূচি। এই পর্যায়ে সরকার ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে আরও বিশদ তথ্য সংগ্রহ করে গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ার বাস্তবিক প্রভাব নির্ণয় করা হবে।
বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হল, গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে বিদ্যমান পছন্দসই বাজার প্রবেশাধিকার বজায় রাখার জন্য কোনো দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তি না থাকলে রপ্তানির ওপর বড় ধাক্কা লাগতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ ৩৮টি দেশ ও বেশ কয়েকটি বাণিজ্য ব্লকে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকার প্রবেশাধিকার পায়, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৭৩ শতাংশকে সুরক্ষিত করে।
অভ্যন্তরীণভাবে অবকাঠামো, লজিস্টিক্স, পণ্যের বৈচিত্র্যহীনতা এবং উচ্চ উৎপাদন খরচের মতো দুর্বলতা রয়েছে, যা আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় দেশের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতাকে সীমিত করে। এই কাঠামোগত সমস্যাগুলি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে রপ্তানির বাজার হারানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
উৎপাদক সংস্থাগুলি অনুমান করে যে, সরকার যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়াই গ্র্যাজুয়েশন চালিয়ে গেলে বর্তমানে পছন্দসই শর্তে রপ্তানিকৃত পণ্যের বার্ষিক আয় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেতে পারে। এই ক্ষতি মূলত শুল্কমুক্ত সুবিধা হারিয়ে যাওয়া এবং নতুন শুল্ক কাঠামোর মুখে পড়ার ফলে হবে।
বহু গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার, হ্রাস পেতে পারে। এই পরিমাণ দেশের মোট রপ্তানি আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যা সরাসরি বাণিজ্যিক সেক্টরের মুনাফা ও কর্মসংস্থানকে প্রভাবিত করবে।
বর্তমানে রপ্তানিকৃত পণ্যের বেশিরভাগই শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকার প্রবেশাধিকার পায়, যার মধ্যে পোশাক শিল্প, জুটের পণ্য, চা, ইলিশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক পণ্য অন্তর্ভুক্ত। এই সেক্টরগুলো যদি নতুন শুল্ক শর্তে প্রতিযোগিতা করতে না পারে, তবে রপ্তানি আয় হ্রাসের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সংকটও দেখা দিতে পারে।
বিজনেস নেতারা পরবর্তী সরকারকে অন্তত ছয় বছরের গ্র্যাজুয়েশন স্থগিতের জন্য অনুরোধ করার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছেন। তারা দাবি করছেন, এই সময়কালে নতুন বাণিজ্য চুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় নীতি গঠন করা সম্ভব হবে।
সারসংক্ষেপে, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ায় সময়মতো সঠিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থা ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধাক্কা লাগতে পারে। তাই সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টা, নতুন বাজার চুক্তি এবং উৎপাদন খরচ কমানোর কৌশল গঠনই ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হবে।



