বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ডিসেম্বর মাসে $৩.৯৬ বিলিয়ন পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ১৪.২৫ শতাংশ কম। রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে হ্রাসের প্রবণতা দেখাচ্ছে এবং এই মাসটি পঞ্চম মাস ধারাবাহিক পতনের চিহ্ন বহন করে।
রপ্তানির মূলধারার গঠনকারী পোশাক শিল্পও একই হ্রাসের মুখোমুখি। পোশাক রপ্তানি, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ শতাংশের বেশি অংশ, ডিসেম্বর মাসে $৩.২৩ বিলিয়নে নেমে এসেছে, যা পূর্ববছরের তুলনায় ১৪.২৩ শতাংশের হ্রাস নির্দেশ করে।
অবশ্যই, মাসিক ভিত্তিতে কিছু স্বল্পমেয়াদী উন্নতি লক্ষ করা যায়। নভেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বরের রপ্তানি আয় ১.৯৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাময়িকভাবে রপ্তানি প্রবাহে স্থিতিশীলতা নির্দেশ করে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এই তথ্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জানিয়েছে যে, মাসিক বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝেও রপ্তানি গতি কিছুটা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে একই সঙ্গে EPB উল্লেখ করেছে যে, বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা রপ্তানি শিল্পের সামগ্রিক চ্যালেঞ্জকে বাড়িয়ে তুলছে।
বছরের প্রথমার্ধে, অর্থবছর ২০২৫-২৬ (জুলাই-ডিসেম্বর) মোট রপ্তানি আয় $২৩.৯৯ বিলিয়ন রেকর্ড করেছে, যা পূর্ববছরের একই সময়ের $২৪.৫৩ বিলিয়ন থেকে ২.১৯ শতাংশ কম। এই হ্রাসের পেছনে মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদার হ্রাস এবং মুদ্রা বিনিময় হারের ওঠানামা উল্লেখ করা যায়।
পোশাক রপ্তানি হ্রাসের ফলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। রপ্তানি আয়ের হ্রাস সরাসরি কারখানা উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি-নির্ভর অঞ্চলের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গাজীপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের গার্মেন্টস পার্কগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবেশে মন্দার ছাপ স্পষ্ট, বিশেষ করে ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকান বাজারে চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। এই বাজারগুলোই বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির প্রধান গন্তব্য, ফলে চাহিদা হ্রাস সরাসরি রপ্তানি পরিমাণে প্রভাব ফেলছে।
বিনিয়োগকারী ও শিল্প সংস্থাগুলো এখনো রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিচ্ছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নতুন বাজারে প্রবেশের চেষ্টা বাড়ছে, তবে এই প্রচেষ্টা সময়সাপেক্ষ এবং তাত্ক্ষণিক রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা ইঙ্গিত করছেন যে, রপ্তানি শিল্পের পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদে সম্ভব হতে পারে, যদি বৈশ্বিক চাহিদা পুনরায় বৃদ্ধি পায় এবং স্থানীয় উৎপাদন খরচ কমে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে মুদ্রা অবমূল্যায়ন, কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক ব্যয় বাড়া রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
সরকারি নীতি দিক থেকে রপ্তানি সমর্থন কর্মসূচি, যেমন রপ্তানি বীমা, আর্থিক সহায়তা এবং ট্যাক্স রিবেট, পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধরনের পদক্ষেপ রপ্তানি শিল্পের চাপ কমাতে এবং উৎপাদনকারীদের নতুন বাজার অনুসন্ধানে সহায়তা করতে পারে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিবেশে চলমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা রপ্তানি প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) দেশের দক্ষিণাঞ্চলকে আলাদা করতে গণভোটের আহ্বান জানায়। যদিও এটি সরাসরি বাংলাদেশের রপ্তানি সঙ্গে যুক্ত নয়, তবে বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও বাণিজ্য পথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সারসংক্ষেপে, ডিসেম্বর মাসে রপ্তানি আয়ের হ্রাস এবং ধারাবাহিক পতন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যের জন্য সতর্ক সংকেত বহন করে। যদিও মাসিক ভিত্তিতে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে বৈশ্বিক চাহিদা পুনরুজ্জীবন, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বৈচিত্র্যকরণ জরুরি।



